
দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারত যখন ক্রমাগত তার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের হারাচ্ছে, তখন এক নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতন, শ্রীলংকায় গোতাবায়া রাজাপাকসের বিদায় এবং মালদ্বীপে ভারতবিরোধী প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুইজুর অভ্যুদয়—সব মিলিয়ে নয়াদিল্লির ঐতিহ্যবাহী প্রভাববলয় সংকুচিত হয়ে এসেছে। ঠিক এ প্রেক্ষাপটেই নেপালে রাজতন্ত্র পুনর্বাসনের আন্দোলনের পেছনে ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী বলয়ের পরোক্ষ সমর্থনের আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার পতন ও শ্রীলংকায় অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকের নেতৃত্বে বামপন্থী সরকারের উত্থান ভারতের প্রভাববলয়ে বড় ধাক্কা। এমন পরিস্থিতিতে নেপালে আবার একটি ‘প্রো-ইন্ডিয়া’ শক্তিকে কার্যকর করার চেষ্টা দিল্লির স্বাভাবিক কৌশলগত প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়াতে পারে।
নেপালে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয় ২০০৮ সালে। কিন্তু ২০২৪ সালে এসে জ্ঞানেন্দ্র শাহকে পুনরায় সিংহাসনে বসানোর দাবি উঠেছে। যাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রজাতান্ত্রিক পার্টি। এ পটভূমিতে প্রশ্ন উঠছে নেপালে জ্ঞানেন্দ্র শাহকে পুনরায় সিংহাসনে বসানোর আন্দোলনের পেছনে ভারতের কোনো পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে কিনা? নেপালের রাজতন্ত্রপন্থীরা ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানাচ্ছে, যা ভারতের হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আদর্শিকভাবে অভিন্ন। গোরক্ষনাথ মঠের সঙ্গে শাহ রাজবংশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক এবং যোগী আদিত্যনাথের পোস্টার নেপালি মিছিলে উপস্থিত থাকাও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। ভারত সরকার এ আন্দোলনে প্রকাশ্যে নিজেদের না জড়ালেও দেশটির শাসক দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) কার্যক্রম সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। এছাড়া ভারতীয় ডানপন্থীরা নেপালের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের প্রতি বিরূপ, কারণ এটি হিন্দুত্ববাদের পরিচয় মুছে দিয়েছে।
নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি বিশ্লেষক গৌরব ভট্টরাইয়ের মতে, ‘নেপালে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন মূলত রাজনীতিকদের ব্যর্থতা, দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন এবং জনগণের হতাশার ওপর ভর করেই বেড়ে উঠেছে। যদিও আন্দোলনটি একটি সাংগঠনিক কাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলবোধের অভাবে দুর্বল, তবু এটি দেশের রাজনৈতিক শূন্যতা ও পরিচয় সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে রাজতন্ত্র একটি প্রতীকী নস্টালজিয়ার চেয়ে বেশি কিছু নয়।’
তিনি বলেন, ‘ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে এ আন্দোলনের কিছু আদর্শিক মিল আছে, তবে এগুলো কাঠামোগত সম্পর্ক নয়, বরং আঞ্চলিক রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রভাবে গঠিত। রাজা জ্ঞানেন্দ্রকে ঘিরে রাজতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনকে ভারতের হিন্দু–বৃহত্তর জাতীয়তাবাদ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, যা গণতন্ত্রে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।’ তিনি হুঁশিয়ার করেন, ‘যদি ভারত বা তার প্রভাবশালী চক্রগুলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কিছু নির্দিষ্ট পরিচয়ভিত্তিক গোষ্ঠীকে সহায়তা করে, তাহলে তা নেপালের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও বৈদেশিক কূটনীতি—উভয় ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা ডেকে আনবে।’
নেপাল একসময় আমদানিনির্ভরতায় ভারতের ওপর ৬৪ শতাংশ নির্ভরশীল ছিল। এখন তা কমে ৬২ শতাংশে এসেছে। বিপরীতে চীনের অংশ ১৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৯ শতাংশে পৌঁছেছে। চীনের সঙ্গে রেল ও সড়ক যোগাযোগ প্রকল্প, বিমানবন্দর নির্মাণ, বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে বেইজিং ক্রমাগত কাঠমান্ডুর ঘনিষ্ঠ অংশীদার হয়ে উঠছে। এতে ক্ষুব্ধ ভারত। নেপালের যেসব জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে চীনের অংশ আছে, সেখান থেকে ভারত বিদ্যুৎ কিনতে অস্বীকৃতি জানায়।
নেপাল একটি জলপ্রবাহ-সমৃদ্ধ পার্বত্য দেশ, যার হিমালয় নদীগুলো বিশাল সম্ভাবনাময় জলবিদ্যুৎ উৎস। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই এ জলবিদ্যুৎ আমদানির মাধ্যমে নিজস্ব জ্বালানিনির্ভরতা হ্রাস এবং নেপালকে প্রভাববলয়ে রাখার কৌশল নিয়েছে। পাশাপাশি ভারতের সহযোগিতায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ বাংলাদেশেও সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নিয়েছে যখন ভারত স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় চীনের বিনিয়োগে নির্মিত জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে কোনো বিদ্যুৎ তারা কিনবে না। এটি নেপালের সামনে একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি করছে। একদিকে বিকাশের জন্য তাদের চীনা মূলধনের প্রয়োজন। অন্যদিকে ভারতের বাজারে প্রবেশের জন্য দিল্লির স্বীকৃতির প্রয়োজন। এ দ্বৈত চাপ নেপালের পররাষ্ট্রনীতিকে বারবার দোলাচলে ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাজতন্ত্রপন্থীরা এ মুহূর্তে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও তাদের মাধ্যমে চীনের ঘনিষ্ঠ কোনো সরকারকে ‘ব্যালান্স’ করার সুযোগ ভারতের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। এছাড়া ভারতীয় হিন্দুত্ববাদী শক্তির আঞ্চলিক প্রভাব শুধু আদর্শিক নয়, তা কার্যকরভাবেই কূটনৈতিক অস্ত্রেও রূপ নিচ্ছে। নেপালের রাজতন্ত্র আন্দোলন যেমন হিন্দু পরিচয়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠা চায়, তেমনি ভারতের হিন্দুত্ববাদও এক বিস্তৃত দক্ষিণ এশিয়ান চেতনার অংশ হতে চায়। ভারত সরকারও চায় না নেপাল চীনের পূর্ণ বলয়ে ঢুকে পড়ুক, আবার সরাসরি হস্তক্ষেপের দায়ও নিতে চায় না। এ দোলাচলে নেপালের রাজতন্ত্রপন্থীদের আন্দোলন হয়ে উঠেছে ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের জন্য এক সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার, যা ভবিষ্যতের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ।
সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের গবেষক সাহসরণশু দাশের মতে, ‘ভারতীয় হিন্দু জাতীয়তাবাদ নেপালের রাজতন্ত্র পুনরুদ্ধারকে কৌশলগত সুযোগ হিসেবে তুলে ধরছে এটা সত্যি। তবে তা এক ধরনের বিভ্রম কেবল। নেপালের জটিল সমাজ ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ আবেগমূলক ধারণা কার্যত অবাস্তব এবং ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক স্বার্থের জন্যও বিপজ্জনক হতে পারে।’
নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যেমন আদর্শিকভাবে বিভক্ত, তেমনি বহিঃসম্পর্কেও ভারসাম্যহীন। দেশটির রাজনৈতিক পরিসরে বর্তমানে প্রধান পাঁচটি শক্তি সক্রিয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল) চীনঘেঁষা জাতীয়তাবাদী অবস্থান নিয়েছে। অপরদিকে, ঐতিহ্যবাহী নেপালি কংগ্রেস ভারতঘনিষ্ঠ, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা ভারসাম্য রক্ষা করার নীতিতে চলছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দাহালের নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী সেন্টার) একসময় ভারতের সহযোগিতাপ্রাপ্ত হলেও বর্তমানে তারা চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। রাজতন্ত্রপন্থী রাষ্ট্রীয় প্রজাতান্ত্রিক পার্টি ভারতের দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী বলয়ের সঙ্গে আদর্শিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর সীমান্তবর্তী মধেসি দলগুলো ঐতিহাসিকভাবে ভারতের প্রতি সমর্থনশীল।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী হন পুষ্পকমল দাহাল। তিনি বর্তমানে জোট সরকারের নেতৃত্বে রয়েছেন, যেখানে নেপালি কংগ্রেস অন্যতম বড় শরিক। প্রেসিডেন্ট পদে আছেন রামচন্দ্র পৌডেল, যিনি নেপালি কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা। অর্থাৎ সরকারে একদিকে মাওবাদী চীনঘেঁষা অংশ, অন্যদিকে ভারসাম্যবাদী ভারতপন্থী অংশও রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কৌশলগত অভিমুখ চীনমুখী বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। পুষ্পকমলের নেতৃত্বে নেপাল বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে সক্রিয় এবং চীনা বিনিয়োগে অবকাঠামোগত উন্নয়নে জোর দিচ্ছে। ভারতকে একদিকে সংলাপে রাখলেও মূল বেইজিংয়ের দিকেই ঝুঁকছে বর্তমান সরকার।
এ পরিস্থিতি রাজতন্ত্রপন্থীদের উত্থানের পেছনে ভারতের শক্ত সমর্থন রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং বা ‘র’ নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অপ্রকাশ্যভাবে সক্রিয়। এমনকি নেপালের অনেক রাজনৈতিক নেতা একাধিকবার প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, ‘ওলি প্রকাশ্যে ভারতবিরোধী হলেও পর্দার আড়ালে “র”-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখেন।’ তাদের অভিযোগ, বরাবরই ভারতবিরোধিতা করলেও ওলি কখনই ভারতের পুরোপুরি বাইরে যেতে চাননি। বরং তিনি চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা দেখিয়ে ভারতকে চাপে রেখে সুবিধা আদায়ের কৌশল নেন। কিন্তু পর্দার আড়ালে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখেন যাতে প্রয়োজনে দিল্লির সমর্থনও পাওয়া যায়। এ দ্বৈততা ভারত-নেপাল সম্পর্ককে আরো অনিশ্চিত ও অবিশ্বাসপূর্ণ করে তুলেছে। ভারতের প্রভাববলয়ে ক্রমেই কমে আসা দেশের তালিকায় নেপাল এখন স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত। ফলে রাজতন্ত্রপন্থীদের উত্থানকে নয়াদিল্লি একপ্রকার ‘সাবস্টিটিউট বলয়ের সম্ভাবনা’ হিসেবেও দেখতে পারে।