
অর্থনীতি প্রতিবেদক: বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারের অস্থিরতায় ব্যবসায়ীরা এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। এমন এক সময়ে সরকার রাজস্ব আয় বাড়াতে কর ও ভ্যাট সংগ্রহ জোরদার করতে চায়, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—অর্থনৈতিক চাপে অনেক ব্যবসায়ীই এখন ভ্যাট কমপ্লাইন্সে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন।
চলতি অর্থবছরে (২০২৪-২৫) মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। আমদানি ব্যয় বেড়েছে, ব্যাংকে ঋণ পাওয়া কঠিন, আর ক্রেতা কমেছে বাজারে। ছোট ও মাঝারি ব্যবসার মালিকরা বলছেন, “বিক্রি কমে গেছে, খরচ বেড়েছে, এখন নিয়ম মেনে ভ্যাট দেওয়ার মতো অবস্থা নেই।”
একজন টেক্সটাইল উদ্যোক্তা বলেন,
“মাসের শেষে শুধু বিদ্যুৎ বিল আর ভ্যাটের হিসাব মিলাতেই মাথা ঘুরে যায়। বিক্রি আগের মতো না, তাই রিটার্ন দাখিলের খরচও এখন বাড়তি চাপ।”
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR)-এর কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক ব্যবসায়ী এখনও মনে করেন ভ্যাট একটি আলাদা আইন, অথচ এটি একটি ব্যবস্থাগত কাঠামো (System within Law) — অর্থাৎ, এটি “Value Added Tax and Supplementary Duty Act, 2012” আইনের অধীনে পরিচালিত একটি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া। এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো ব্যবসায়িক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রের রাজস্ব ভিত্তি শক্তিশালী করা।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী:
অর্থবছর নিবন্ধিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়মিত রিটার্ন দাখিল (%)
২০১৯–২০ ২.৮ লাখ ৬৫%
২০২১–২২ ৩.৪ লাখ ৬২%
২০২৩–২৪ ৪.১ লাখ ৬৩%
অর্থাৎ, রেজিস্ট্রেশনের হার বাড়লেও নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার হার স্থবির। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সফটওয়্যারের জটিলতা ও রিটার্ন প্রক্রিয়ার খরচই এর মূল কারণ।
সরকার ইতোমধ্যে “অনলাইন ভ্যাট রিটার্ন ও ভ্যাট সফটওয়্যার” চালু করেছে। এতে বড় কোম্পানিগুলো কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে, কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা প্রযুক্তিগত সহায়তা না পেয়ে বিপাকে পড়েছেন।
ভ্যাট বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল সিস্টেম ব্যবসায়ীর জন্য আশীর্বাদ হতে পারে, যদি তা সহজ ও ব্যবহারবান্ধব করা যায়। বর্তমানে অনেক ছোট ব্যবসায়ী মনে করেন এটি অতিরিক্ত প্রশাসনিক বোঝা।”
অর্থনীতিবিদ ও কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটে সরকারকে ব্যবসায়ীর বাস্তবতা বিবেচনা করে কিছু সংস্কার আনতে হবে:
• ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার জন্য সহজ ভ্যাট প্রক্রিয়া (Simplified VAT).
• নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন দাখিলকারীর জন্য ইনসেনটিভ বা কর ছাড়।
• ডিজিটাল প্রশিক্ষণ ও কর পরামর্শ সেবা সম্প্রসারণ।
• কমপ্লাইন্সকে শাস্তি নয়, অংশীদারিত্বমূলক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা।
অর্থনীতির বেহাল অবস্থায় ভ্যাট কমপ্লাইন্স জোরদার করা শুধুমাত্র আইনি নয়, রাজনৈতিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জও বটে। ব্যবসায়ীকে শত্রু নয়, সহযোগী হিসেবে দেখা গেলে রাজস্ব ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা দুটোই বাড়বে। একটি “সহজ, ডিজিটাল ও ব্যবসাবান্ধব ভ্যাট সিস্টেম” এখন সময়ের দাবি—যাতে ব্যবসা টিকে থাকে, আর রাষ্ট্র পায় তার ন্যায্য রাজস্ব।