
*দৃশ্যপট:* কদম আলী আজ একটি ফার্নিচারের দোকানে গেছেন। দোকানের সোফার গায়ে কোনো ট্যাগ নেই। দরদাম করে দাম ঠিক হলো ৫০,০০০ টাকা। কিন্তু বিল দেওয়ার সময় দোকানদার হুট করে বলল, "স্যার, এর সাথে ১৫% ভ্যাট আলাদা যোগ হবে।" কদম আলী চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে আনলেন। অমনি পাশের আয়নায় ভেসে উঠল এলিয়েন একা’র মুখ।
একা(এলিয়েন কদম আলী):(আয়না থেকে ফিসফিস করে) "কদম ভাই, এবারও কি সেই ‘ইনক্লুসিভ’ গ্যাঁড়াকল? কিন্তু এখানে তো কোনো দাম লেখাই ছিল না!"
বাস্তব কদম আলী (বকা): থামো একা! এখানে খেলাটা আরও সূক্ষ্ম। শোনো ভাই বিক্রেতা, ভ্যাট আইন ২০১২-এর ৪২ ও ৪৩ ধারা অনুযায়ী, আপনি আমার সাথে যে ৫০ হাজার টাকার ‘লেনদেন মূল্য’ বা Transaction Value ঠিক করলেন, আইন বলে এই মূল্যই হবে Inclusive of VAT । আপনি পরে আলাদা করে ভ্যাট যোগ করার কথা বলে আমাকে ধোঁকা দিতে পারেন না।"
বিক্রেতা:স্যার, আমরা তো পাইকারি কিনি, ভ্যাট তো আলাদা হিসাব করি। দাম তো আমি কমিয়ে রাখছি।"
বকা: আইন দাম কমানো বা বাড়ানো চেনে না। আইন বলে, যখনই কোনো পণ বা প্রতিদান (Consideration) নির্ধারিত হয়, তার ভেতরেই ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। আপনি যদি ১ টাকাতেও জিনিস বিক্রি করেন, তবে ওই ১ টাকার ভেতরেই ভ্যাট আছে। আলাদা করে ভ্যাট দাবি করা মানে হলো চুক্তির খেলাপ এবং আইনের লঙ্ঘন।"
পরকীয়া বনাম ট্রানজ্যাকশন ভ্যালু: কদম আলীর চরম ব্যাখ্যা।
এলিয়েন একা এবার আয়না থেকে বেরিয়ে এসে কদম আলীর পাশে দাঁড়াল। "কদম ভাই, পরকীয়ার সাথে এটার লিংকটা কোথায়? এটা তো দামাদামির ব্যাপার! তুমি সব কিছুর মধ্যে পরকীয়া আনো কেন? তুমি বারবার এক জিনিস টানো, ইচ্ছা থাকলে নিজে কর।
বকা: (মুচকি হেসে) "লিংকটা গভীর একা! পরকীয়া কি হুট করে হয়? না, এটা একটা ‘লেনদেন’। যখন কেউ কারও সাথে মন দেওয়া-নেওয়া করে, তখন সেটা একটা অঘোষিত ‘লেনদেনের মূল্য’ বা ট্রানজ্যাকশন। মানুষ আশা করে যে এই সম্পর্কের ভেতরেই সব সম্মান, সময় আর ভালোবাসা থাকবে (Inclusive)।"
একা: তারপর?
*বকা:* "কিন্তু কিছু মানুষ আছে যারা সম্পর্কের মাঝপথে এসে আলাদা করে ‘এক্সট্রা সুবিধা’ বা ‘গোপন ডিমান্ড’ (Extra VAT) দাবি করে বসে। মেইন সম্পর্কের বাইরে এই যে আলাদা ‘ভ্যালু’ দাবি করা—এটাই তো পরকীয়া। ভ্যাট আইনে যেমন লেনদেন মূল্যের বাইরে আলাদা ভ্যাট চাওয়া অবৈধ, সম্পর্কের ক্ষেত্রেও মেইন কমিটমেন্টের বাইরে অন্য কিছু খোঁজাটা হলো ‘কন্ট্রাক্ট ব্রিচ’ বা চুক্তির বরখেলাপ।" সব কিছুর মধ্যে পরকীয়া আনার মূল হল এটাও ভ্যাট এর সামাজিক অসচতনার কারণে বহু গুণে বেড়ে গেছে। যেমন ভোক্তা ভ্যাট জানে না পলিসি ও ব্যবসায়ী যা ইচ্ছা করছে।
একা:(হেসে অস্থির) "তার মানে দোকানদার যেমন দাম ঠিক করার পর ভ্যাট আলাদা চায়, পরকীয়াকারীও সম্পর্কের মাঝপথে নতুন ‘সোর্স’ খোঁজে!"
বাস্তব কদম আলী এলিয়েন বন্ধুকে আরও বিস্তারিত বুঝিয়ে বললেন:
1. ধারা ৪২ ও ৪৩-এর মূল কথা:** সরবরাহকারী যখন কোনো পণ্যের দাম নির্ধারণ করেন, তখন ক্রেতা যে অর্থ প্রদান করেন তাকেই ‘পণ’ বলা হয়। আর আইন স্পষ্টভাবে বলে, এই পণ-ই হবে ভ্যাটসহ মূল্য।
2. ভোক্তার সুরক্ষা: সাধারণ মানুষ মনে করে গায়ের দাম লেখা না থাকলে বুঝি আলাদা ভ্যাট দিতে হয়। অথচ আইন ক্রেতাকে সুরক্ষা দেয়—তুমি যে দামে রাজি হবে, সেটাই চূড়ান্ত।
3. সিস্টেম ট্রাস্টের অভাব: কেন দোকানদার এটা করে? কারণ সে চায় মূল দামটা কম দেখিয়ে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে, আর পরে ভ্যাটের দোহাই দিয়ে নিজের লাভ বাড়াতে। এটাই হলো ‘প্রাইস ম্যানিপুলেশন’।
একা: কদম ভাই, আপনাদের গ্রহের মানুষরা তো দেখি খুবই চালাক! তারা ভ্যাটকে ব্যবহার করে ব্যবসা বাড়াতে, আবার ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে নিজেদের পকেট ভরতে।"
বকা: ঠিক বলেছ একা। এই যে ‘সিস্টেম ট্রাস্ট’ নেই বলেই আজ মানুষ আইনের অপব্যাখ্যা দিচ্ছে। যদি লেনদেনটা স্বচ্ছ হতো, তবে ভ্যাট নিয়ে এই লুকোচুরি থাকতো না।"
বিদায়ের মুহূর্ত: হাল ছেড়ো না বন্ধু**
এলিয়েন একা চলে যাওয়ার আগে কদম আলীর কাঁধে হাত রাখল। "কদম ভাই, আপনি যে আজ দোকানদারের ওই ‘এক্সট্রা ভ্যাট’ ডিমান্ড রিজেক্ট করলেন, এটাই আপনার বিজয়। আপনার এই ছোট ছোট শিক্ষাগুলোই একদিন বড় পরিবর্তন আনবে।"
সে মহাকাশযানে চড়ে বসতে বসতে আকাশ কাঁপিয়ে গেয়ে উঠল:
হাল ছেড়ো না বন্ধু, বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে,
দেখা হবে তোমার সনে, অন্য কোনো ভোরে।
কদম আলী সোফাটা না কিনেই বেরিয়ে এলেন। তার মনে হলো, আজ তিনি ভ্যাটের চেয়েও বড় একটা সত্য জিতেছেন।