
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলের সেমিনার কক্ষে বসে আছেন 'এলিয়েন কদম আলী'। তিনি মহাকাশের কোনো এক উন্নত গ্রহ থেকে এসেছেন, যেখানে ব্যবসা চলে স্রেফ লজিক আর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড (IAS) দিয়ে। তার পাশে মলিন মুখে বসে আছেন আমাদের মাটির মানুষ 'বাস্তব কদম আলী'। সামনে রাখা এক কাপ চা ঠান্ডা হয়ে জল হয়ে গেছে, কিন্তু বাস্তব কদম আলীর ভ্যাটের জট খুলছে না।
আজকের আলোচনার বিষয়: *"ভ্যাট আইন কি আমাদের বোঝে না, নাকি আমরা ভ্যাট বুঝি না?
১. অ্যাকাউন্টিংয়ের স্বর্গ ও ভ্যাটের নরক
এলিয়েন কদম আলী তার চকচকে ট্যাব বের করে বললেন, "ভাই বাস্তব, আমি তো হিসাব মেলাতে পারছি না। তোমরা ব্যবসা করো কেনা-বেচার পার্থক্যে লাভ করার জন্য। তোমার অ্যাকাউন্টস টিম তো বেশ দক্ষ, তারা প্রতিটা পয়সার ট্র্যাকিং রাখছে। তাহলে এই যে 'কনসালট্যান্ট' নামের একটা প্রজাতিকে তোমরা কোটি কোটি টাকা দিচ্ছ, এদের কাজ কী?"
বাস্তব কদম আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "ভাই এলিয়েন, তোমার ওই গ্রহে হয়তো ২ আর ২ যোগ করলে ৪ হয়। আমাদের ভ্যাট আইনে ২ আর ২ যোগ করলে মাঝেমধ্যে ৫ হয়, আবার মাঝেমধ্যে ভ্যাট অফিসার চাইলে সেটাকে শূন্যও বানিয়ে দিতে পারেন।"
বাস্তব কদম আলীর মতে, ব্যবসায়ীরা অ্যাকাউন্টস টিমকে পছন্দ করেন। কারণ তারা মালিককে আয়না দেখায়। কিন্তু ভ্যাট আইন সেই আয়নার ওপর একটা ধোঁয়াশা তৈরি করে রেখেছে। সেই ধোঁয়াশা পরিষ্কার করতেই দরকার হয় ভ্যাট উকিল বা কনসালট্যান্ট।
২. কেন এই কনসালট্যান্ট নির্ভরতা?
প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের ৯৫% মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ী একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ অ্যাকাউন্টস টিম থাকা সত্ত্বেও বাইরের কনসালট্যান্টের ওপর নির্ভরশীল। কেন?
ক) রেয়াতের গোলকধাঁধা: এলিয়েন কদম আলী অবাক হয়ে শুনলেন যে, বাস্তব কদম আলী ১০০ টাকা ভ্যাট দিয়ে মাল কিনেও সেই টাকা ফেরত (Credit) পাচ্ছেন না। কেন? কারণ যার কাছ থেকে কিনেছেন, সেই বিক্রেতা হয়তো সিস্টেমে টাকা জমা দেয়নি।
এলিয়েন কদম আলী বললেন, "এ তো ভারী অন্যায়! আমি টাকা দিলাম, সরকার পেল না, তার শাস্তি আমি পাব কেন?"
বাস্তব কদম আলীর উত্তর, "এটাই ভ্যাট আইন ২০১২। এখানে অন্যের পাপের প্রায়শ্চিত্ত ক্রেতাকে করতে হয়। আর এই মারপ্যাঁক থেকে বাঁচতে লাগে কনসালট্যান্ট।"
খ) সহগ বা ইনপুট-আউটপুট কো-এফিসিয়েন্ট:
এটি ভ্যাট আইনের এক অদ্ভুত সৃষ্টি। আপনি ১ কেজি আটা দিয়ে কয়টি বিস্কুট বানাবেন, তা আগেভাগেই ভ্যাট অফিসকে জানাতে হবে। যদি বিস্কুট একটা কম হয়, তবেই বিপদ! এলিয়েন কদম আলী হাসতে হাসতে বললেন, "আমাদের গ্রহে তো এটা রোবট ঠিক করে দেয়।" বাস্তব কদম আলী বিরস মুখে বললেন, "আমাদের এখানে এটা ঠিক করে দেয় কনসালট্যান্ট আর ভ্যাট অফিসারের দরকষাকষি।"
৩. শিক্ষিত বেকার বনাম দক্ষ উকিল
বাস্তব কদম আলীর আক্ষেপ হলো, তিনি তার অ্যাকাউন্টস টিমকে অনেক বেতন দেন। তারা সিএ (CA) বা এসিএমএ (ACMA) পড়ছে। কিন্তু ভ্যাট অফিসের অডিটর যখন আসে, তখন এই মেধাবী ছেলেমেয়েরা কোণঠাঁসা হয়ে পড়ে।
"আমার ছেলেরা আইএএস (IAS) দিয়ে ব্যালেন্স শিট মেলায়, আর ভ্যাট অফিসার এসে খোঁজে 'মূসক-৬.৩' এর সিরিয়াল কেন কাটাকাটি হয়েছে। আমার ছেলেরা যখন বলে লজিক্যালি এটা ঠিক, অফিসার তখন আইনের ধারা ১৮ এর উপধারা ৪ দেখিয়ে দেয়। ব্যস, আমার টিম কাত! তখনই আমাকে ফোন দিতে হয় সেই নামি উকিলকে, যিনি হিসাব বুঝুক আর না বুঝুক, অফিসারের সাথে চা খেতে খেতে ফাইল ঠান্ডা করতে পারেন।"
৪. ভ্যাট যখন ব্যবসার অংশ নয়, বরং 'বাড়তি আপদ'
নিউজ প্রতিবেদনে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে—অধিকাংশ ব্যবসায়ী ভ্যাটকে ব্যবসার ব্যয়ের অংশ মনে করেন না। তারা মনে করেন এটা একটা 'পেনাল্টি'।
এলিয়েন কদম আলী প্রশ্ন করলেন, "সরকার তো সিস্টেম ডিজিটাল করেছে, ইএফডি (EFD) মেশিন দিচ্ছে। তাতেও কি কাজ হচ্ছে না?"
বাস্তব কদম আলী হো হো করে হেসে উঠলেন। "মেশিন তো ভাই জড় বস্তু। ওটা তো আর বোঝে না যে আমার সাপ্লাই চেইন কত জটিল। সরকার চায় সব ডিজিটাল হোক, কিন্তু তাদের অফিসাররা এখনো এনালগ ফাইলে সই খুঁজতে পছন্দ করেন। ডিজিটাল সিস্টেমে স্বচ্ছতা বাড়ে, আর স্বচ্ছতা বাড়লে কনসালট্যান্টদের রুটি-রুজি কমে। তাই সিস্টেমটা এমনভাবে রাখা হয়েছে যেন সেটা সাধারণ মানুষের মাথায় না ঢোকে।"
৫. কদম আলীদের মহাদর্শন
আলোচনার শেষ পর্যায়ে এলিয়েন কদম আলী একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, "কেন তোমরা এমন একটা সফটওয়্যার বানাও না, যেখানে অ্যাকাউন্টিং করলেই ভ্যাট রিটার্ন অটো-জেনারেট হবে? যেখানে উকিলের কোনো কাজ থাকবে না?"
বাস্তব কদম আলী তার পকেট থেকে এক দলা পান মুখে দিয়ে বললেন, "ভাই এলিয়েন, তুমি আসলেই ভিনগ্রহের মানুষ। যদি সিস্টেম সহজ হয়ে যায়, তবে কনসালট্যান্টরা কী খাবে? ভ্যাট অফিসের গুরুত্ব কোথায় থাকবে? আর উকিলরা যদি কোর্টে গিয়ে 'মাই লর্ড' বলে টেবিল না চাপড়াতে পারে, তবে আইনের মর্যাদা থাকবে কোথায়?"
বাস্তব কদম আলীর মতে, এই সিস্টেমটি আসলে ব্যবসায়ীদের *"জিম্মি"* করে রাখার একটি কৌশল। ব্যবসায়ীরা চায় স্বচ্ছতা, কিন্তু আইন চায় জটিলতা। অ্যাকাউন্টিং টিম হলো ব্যবসার 'ইঞ্জিন', আর ভ্যাট কনসালট্যান্ট হলো সেই ইঞ্জিনের 'ঘুষ দেওয়া মবিল'—যা না থাকলে ইঞ্জিন মাঝপথে আটকে যায়।
৬. উপসংহার: কে আসলে কাকে বোঝে না?
প্রতিবেদনের শেষে এসে দেখা যায়, দোষ আসলে কারো একার নয়।
ভ্যাট আইন আমাদের বাস্তবতাকে চেনে না। সে মনে করে দেশের সব ব্যবসায়ী কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার।
আমরা ভ্যাট বুঝি না —কারণ আমরা এটাকে শুধু ট্যাক্স ফাঁকির একটা মাধ্যম হিসেবে দেখি।
সরকার মনে করে আইন যত কঠিন হবে, রাজস্ব তত বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে আইন যত কঠিন হচ্ছে, কনসালট্যান্টদের ফি তত বাড়ছে, সরকারের পকেট সেভাবে ভরছে না।
এলিয়েন কদম আলী শেষে তার মহাকাশযানে ওঠার আগে বলে গেলেন, "তোমাদের এই গ্রহে ব্যবসা করতে হলে অ্যাকাউন্টিংয়ের চেয়ে 'অ্যাক্টিং' বেশি জানতে হয়। তোমাদের ভ্যাট আইন আসলে লজিকের ওপর নয়, ম্যাজিকের ওপর চলে!"
বাস্তব কদম আলী নিচে দাঁড়িয়ে হাত নাড়লেন। কাল সকালে আবার তাকে ভ্যাট অফিসে যেতে হবে, সাথে নিয়ে যাবেন সেই দামি উকিলকে। কারণ তার লাখ টাকা বেতনের অ্যাকাউন্টস টিম আজ আবার ভ্যাটের এক নতুন ধারার সামনে এসে আত্মসমর্পণ করেছে।
প্রতিবেদকের মন্তব্য:* যেদিন অ্যাকাউন্টিংয়ের 'ব্যালেন্স শিট' আর ভ্যাটের 'রিটার্ন' একই ভাষায় কথা বলবে, সেদিনই হয়তো এলিয়েন কদম আলী আর বাস্তব কদম আলী একই সাথে কফি খেতে পারবেন। তার আগ পর্যন্ত, ভ্যাট থাকবে উকিলের পকেটে আর ব্যবসায়ী থাকবে আশঙ্কার পকেটে।