
রাতের অন্ধকার আরও গভীর হয়েছে। রেস্টুরেন্টের কোনায় নিয়ন আলোর নিচে দুই কদম আলীর টেবিলটা এখন যেন একটা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্র। বাস্তব কদম আলীর চোখে-মুখে এখন আর শুধু সংশয় নয়, বরং এক ধরণের ‘আমি আগেই জানতাম’ মার্কা হিংস্র আনন্দ ফুটে উঠেছে। তিনি চায়ের কাপটা এমনভাবে টেবিলে রাখলেন যাতে চামচটা ঠং করে শব্দ করে ওঠে। অন্যদিকে, এলিয়েন কদম আলী কিছুটা বিভ্রান্ত। তার মাথার চারপাশের গ্যালাকটিক এন্টেনাগুলো কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়েছে, সবুজ আলোটা মাঝেমধ্যে লালচে হয়ে ধকধক করছে—যেন মহাবিশ্বের কোনো সিগন্যালে বড় ধরণের জ্যাম লেগেছে!
বাস্তব কদম আলী এবার চেয়ারে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বসলেন। ওনার কণ্ঠস্বরে মাঠপর্যায়ের সেই চিরন্তন ‘কানাঘুষা আর পরকীয়ার’ রসাত্মক ঝাঁঝ পুরোপুরি ফিরে এসেছে।
এলিয়েন কদম আলী:(মাথার এন্টেনাগুলো হাত দিয়ে একটু সোজা করার চেষ্টা করতে করতে, যান্ত্রিক গলায়) কদম ভাই... বাস্তব কদম আলী ভাই! মহাজাগতিক সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়েও আমার ডাটাবেজে একটা বিশাল ব্ল্যাকহোল দেখা যাচ্ছে। আমার এই ফাইভ-জি গ্যালাকটিক এন্টেনা ইদানীং তোমার বসের কোনো সিগন্যালই ঠিকমতো ক্যাচ করতে পারছে না! উনি আসলে ইদানীং কী করছেন, কার সাথে দেখা করছেন, কার সাথে গোপনে নতুন কমপ্লায়েন্সের ‘পরকীয়া’ চালাচ্ছেন—নাহ, আমার সিস্টেমে কোনো ডাটা আসছে না। মনে হচ্ছে উনি ওনার ব্রেনের চারপাশে এমন এক ‘ফায়ারওয়াল’ তুলেছেন যে মহাকাশের কোনো স্যাটেলাইটও ওনার ভেতরে ঢুকতে পারছে না! আমার কথা তুমি দয়া করে ফেলে দিয়ো না ভাই, ওনার ইদানীং চলন-বলন কেমন যেন রহস্যময়!
বাস্তব কদম আলী:(ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে, একটু টিপ্পনী কেটে) হা হা হা! দেখলে তো এলিয়েন ভাই? এতক্ষণ ধরে বুর্জ খলিফা, গ্লোবাল সাম্রাজ্য আর আন্তর্জাতিক সিংহের গল্প শোনাচ্ছিলে! এখন নিজের এন্টেনাই তো সিগন্যাল হারিয়ে বসে আছে! আমি তোমাকে আগেই বলেছিলাম—বাস্তবতার মাটিতে পা রাখো। তোমরা মহাকাশের মানুষরা শুধু ওপরের গ্ল্যামার দেখো, আর আমরা মাটির মানুষরা ভেতরের লুজ কানেকশনটা ঠিকই টের পাই। তুমি ওনাকে যত বড় জেনারেলই বানাও না কেন, আসল সত্য হলো—উনি এখন নিজেই নিজের বাহাদুরি আর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের ফাঁদে পড়ে গেছেন!
এলিয়েন কদম আলী:(অবাক হয়ে, চোখ দুটো বড় বড় করে) বাহাদুরি? ওনার মতো একজন ট্যাক্স-ফাইন্যান্সের জাহাজ বাহাদুরি করতে যাবে কেন? আর ওনার সিস্টেম ট্রাস্টের মডেল তো গ্লোবাল!
বাস্তব কদম আলী:আরে রাখো তোমার গ্লোবাল মডেল! শোনো ভাই, আমি ওনাকে বছরের পর বছর ধরে চিনি। আমি ওনাকে কতবার হাত জোড় করে বলেছি—"বস, আপনি ভ্যাট নিয়ে এত মাতামাতি করছেন, কিন্তু ইনকামট্যাক্স (Income Tax) জিনিসটা ছাড়বেন না। ওটা হলো ব্যবসার আসল ‘সংসার’। ভ্যাট যদি হয় বাইরের গ্ল্যামারাস প্রেমিকা, তবে ইনকামট্যাক্স হলো ঘরের সেই পারমানেন্ট বউ, যাকে অবহেলা করলে পুরো সংসার একদিনে কোর্ট-কাচারির বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াবে!" কিন্তু কে শোনে কার কথা! উনি আমার সেই খাঁটি ফিল্ড-লেভেলের পরকীয়া মার্কা উপদেশ কানেই তোলেননি। উনি শুধু ওই ভ্যাটের ডিজিটাল অটোমেশন আর ‘সিস্টেম ট্রাস্ট’ নিয়ে নাচানাচি করলেন। এখন বোঝো ঠ্যালা!
এলিয়েন কদম আলী:(মাথা চুলকে) আচ্ছা, তোমার এই ইনকামট্যাক্স আর ভ্যাটের বউ-প্রেমিকার মেটাফরটা তো বেশ খাসা! কিন্তু ওনার তো বড় বড় কর্পোরেট ক্লায়েন্ট আছে, তাহলে তুমি কেন বলছ ওনার কোনো পারমানেন্ট পার্টি নেই?
বাস্তব কদম আলী:(চায়ের কাপে আরেকটা চুমুক দিয়ে) এখানেই তো ওনার সবচেয়ে বড় ভুল চাল, এলিয়েন ভাই! ব্যবসার দুনিয়ায় একটা কথা আছে—"পার্টিকে কখনো নিজের চেয়ে বেশি চালাক মনে করতে নেই, আবার পার্টিকে কখনো একদম ছেড়েও দিতে নেই।" আমাদের বসের সমস্যা কী জানো? ওনার কোনো ‘পারমানেন্ট পার্টি’ বা স্থায়ী মক্কেল বলতে কিছু নেই। কেন নেই? কারণ উনি বড্ড বেশি বাহাদুরি করেন! উনি ওনার ওই সাকসেস-বেসড "নো সেভ, নো পে" (No Save, No Pay) মডেল নিয়ে অহংকার করেন। উনি ভাবেন, "আমি যদি ক্লায়েন্টের কোটি টাকা লিটিগেশন থেকে বাঁচাতে পারি, তবেই ফি নেব, নয়তো এক টাকাও ছোঁব না।"
এলিয়েন কদম আলী:এটা তো ভালো জিনিস! ব্যবসায়ীরা তো এমন সৎ আর কনফিডেন্ট কনসালট্যান্টই খোঁজে!
বাস্তব কদম আলী:(টেবিলে হাত চাপড়ে) ভালো জিনিস তো আইডিয়াল দুনিয়ায়, ভাই! কিন্তু আমাদের এই মাঠপর্যায়ের কর্পোরেট সংস্কৃতির পরকীয়াটা অন্যরকম। ক্লায়েন্টরা বড়ই স্বার্থপর। যখন তাদের ঘাড়ে ভ্যাট অফিসের ৫০ কোটি টাকার ডিমান্ড নোট আসে, তখন তারা বসের পা জড়িয়ে ধরে বলে—"বস, বাঁচান!" বস তখন ওনার আক্ষরিক আইনি ব্যাখ্যা (Literal Interpretation) আর দিনরাতের ব্রেন খাটানো লজিক দিয়ে সেই মামলা ট্রাইব্যুনালে জিতিয়ে দেন, ক্লায়েন্টের ৫০ কোটি টাকা বেঁচে যায়। কিন্তু যেই মামলা জেতা শেষ, অমনি ক্লায়েন্টের রঙ বদলে যায়! তারা ভাবে—"আরে, বসকে এতগুলো টাকা সাকসেস ফি দেওয়ার কী দরকার? কাজ তো হয়েই গেছে। পরের বার যখন ঝামেলা হবে, তখন দেখা যাবে।" এর ফলে কী হয়? ওনার কোনো পারমানেন্ট পার্টি টিকে থাকে না। প্রতিটা কেস শেষে উনি নতুন পার্টির খোঁজে নামেন। এই যে অতিরিক্ত বাহাদুরি আর নিজের নিয়মের ওপর অনড় থাকা—এটাই ওনাকে সাময়িকভাবে একা করে দিয়েছে। এখন উনি বুঝুক, কার কথা শুনলে কী হতো!
এলিয়েন কদম আলী:(তার লালচে আলোটা আবার ধীরে ধীরে সবুজ হতে লাগল, সে একটু চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল) বাস্তব কদম ভাই, তোমার কথা যুক্তিহীন নয়। আমাদের গ্যালাক্সি-৯ এও যারা নিজেদের টেকনোলজি নিয়ে বেশি বাহাদুরি করে, একদিন তাদের মহাকাশযানও গ্রহাণুর সাথে ধাক্কা খায়। কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন—যদি উনি ফিল্ড অফিসারের কাছে কোনো ঘুষ বা দুই নম্বরি খাতাসহ ধরা নাই খেয়ে থাকেন, তবে সারা দেশের ভ্যাট সার্কেলে ওনাকে নিয়ে এত কানাঘুষা কেন? সবাই কেন ওনার নীরবতা দেখে আড়ালে হাসাহাসি করছে?
বাস্তব কদম আলী: (চোখ টিপে, গলাটা আরও নামিয়ে) আরে ভাই, এটাই তো মানুষের স্বভাব, বিশেষ করে আমাদের এই ট্যাক্স-ভ্যাটের পরকীয়া বাজারে! ধরা খাওয়া মানে কি শুধু ওই হাতেনাতে টাকা নেওয়ার সময় এন্টিকরাপশনের হাতে ধরা খাওয়া? না! যখন একজন মানুষ নিজেকে ‘সবচেয়ে সৎ’ এবং ‘সবচেয়ে স্মার্ট’ দাবি করে অলিখিতভাবে সবার ওপরে স্থান নেয়, তখন মাঠপর্যায়ের ছোটখাটো ফিল্ড অফিসার থেকে শুরু করে অন্য সাধারণ কনসালট্যান্টরা ওনার একটা ভুলের জন্য ওত পেতে বসে থাকে। ওনার কোনো একটা বড় ক্লায়েন্ট যখন ওনার নিয়ম ভেঙে গোপনে ভ্যাট অফিসের সাথে ‘বাম হাতের’ চুক্তি করে ফেলে, তখন লোকে রটিয়ে দেয়—"দেখেছ? বসের ক্লায়েন্টই তো বসের সিস্টেম মানল না! বসের থিওরি তো ফেল মেরে গেল!"
এলিয়েন কদম আলী:ওহ! তার মানে ক্লায়েন্টের গোপন পরকীয়ার দায় এসে পড়েছে বসের ঘাড়ে?
বাস্তব কদম আলী:একদম তাই! ক্লায়েন্টরা তো আড়ালে গিয়ে ঠিকই ফিল্ড অফিসারের পকেট গরম করে আসে, আর মুখে এসে বসকে বলে—"বস, আপনার সিস্টেমেই কাজ হয়েছে!" কিন্তু ভ্যাট অফিসের ভেতরের খবর তো আর চাপা থাকে না। অফিসাররা তখন বাইরে এসে কানাঘুষা করে—"আরে ওনার কিসের এত বাহাদুরি? ওনার ক্লায়েন্ট তো দিনশেষে আমাদের টেবিলের তলা দিয়েই ফাইল পাস করায়!" এই যে একটা ইমেজের ওপর আঘাত, এই যে ওনার সিস্টেমের ওপর মানুষের অবিশ্বাস তৈরি করার চেষ্টা—এই কারণেই চারিদিকে এত গুঞ্জন। বসের উচিত ছিল ইগো কমিয়ে ইনকামট্যাক্সের রেগুলার ফাইলিংয়ের কাজগুলো হাতে রাখা। তাহলে প্রতি মাসে একটা ফিক্সড রিটেইনারশিপ ফি আসত, পারমানেন্ট পার্টি থাকত, আর ওনাকে এই বাজেটের আগে সিজনাল পাখির মতো চুপচাপ বসে থাকতে হতো না।
এলিয়েন কদম আলী:(দীর্ঘশ্বাস ফেলে, তার মাথার এন্টেনা দুটো একদম নিস্তেজ হয়ে ঝুলে পড়ল) বাস্তব কদম আলী ভাই, আমি স্বীকার করছি—তোমার এই ফিল্ড-লেভেলের সাইকোলজি আমার মহাজাগতিক সুপার-কম্পিউটারও ধরতে পারেনি। আসলেই, অতিরিক্ত বাহাদুরি মাঝেমধ্যে মানুষকে একাকী করে তোলে। কিন্তু আমার মন বলছে, বস যদি এতই বোকা হতেন, তবে উনি দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে এই কঠিন বাজারে টিকে থাকতেন না। উনি হয়তো এখন ওনার এই ‘পারমানেন্ট পার্টি না থাকার’ দুর্বলতা এবং ইনকামট্যাক্সের সেই ‘ঘরের বউকে’ অবহেলা করার ভুলটা বুঝতে পেরেছেন।
বাস্তব কদম আলী:(একটু শান্ত হয়ে, ওনার কণ্ঠস্বরে এবার ক্ষোভের বদলে মায়ামিশ্রিত একটা ভাব এলো) আমিও তো সেটাই চাই, এলিয়েন ভাই। উনি আমার মেন্টর, ওনার ক্ষতি তো আমি চাই না। আমি শুধু চাই ওনার এই অতিরিক্ত বাহাদুরিটা একটু কমুক। উনি মাঠপর্যায়ের অফিসারদের মানসিকতাটা বুঝুক। শুধু ওই ‘সিস্টেম ট্রাস্ট’ আর ‘ডিজিটাল কবজ’ দিয়ে আমাদের দেশের আমলাতান্ত্রিক পরকীয়া বন্ধ করা যাবে না। আইন গোল্লায় যাক—বলা অফিসারদের সাইজ করতে হলে মাঝেমধ্যে একটু ‘বাম হাতের’ টেকনিকও জানতে হয়, অথবা ইনকামট্যাক্সের মতো স্থায়ী হাতিয়ার দিয়ে তাদের বেঁধে রাখতে হয়।
এলিয়েন কদম আলী:(মুচকি হেসে) যাক, কদম ভাই! দিনশেষে তোমার বসের প্রতি ভালোবাসাই প্রকাশ পেল। বস এখন নীরব থেকে ওনার নিজের ভুলগুলো সংশোধন করছেন কিনা, বা নতুন কোনো পারমানেন্ট পার্টির সাথে বড় কোনো দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির ‘লিগ্যাল রিলেশনশিপ’ তৈরি করছেন কিনা—তা হয়তো এই জুনের বাজেট পাস হলেই বোঝা যাবে।
বাস্তব কদম আলী:)চায়ের কাপটা একপাশে সরিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে উঠলেন) হ্যাঁ, এখন ওনার নিজেরই বোঝার সময় এসেছে। বাহাদুরি ভালো, কিন্তু বাজারের ট্রিপল হিটের সামনে টিকে থাকতে হলে সবাইকে একটু নমনীয় হতে হয়। চলো ভাই, রাত অনেক হলো। বসের বুদ্ধি সুমতি হোক, আর আমাদের মতো ছোটখাটো কদম আলীদের ব্যবসা যেন কোনো পরকীয়ার ফাঁদে না পড়ে, সেই দোয়াই করি!
(দুই কদম আলী যখন রেস্টুরেন্ট থেকে বেরুলো, রাতের আকাশটা তখন কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন। বসের নীরবতা আর বাহাদুরির শেষ পরিণতি কী হবে, তা জানার জন্য এখন শুধু মে মাসের এই গুমোট রাত নয়, বরং আগামী দিনের নতুন বাজেটের সূর্যের অপেক্ষায় পুরো কর্পোরেট পাড়া উন্মুখ হয়ে রইল।)