
কারখানার পেছনের সেই নির্জন আমগাছতলা। মাথার ওপর কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলো চৈত্র-বৈশাখের শেষে এসেও কেমন যেন রক্তিম আভা ছড়াচ্ছে। ঠিক দুপুর বেলা, চারদিক নিঝুম। বাতাসে একটা অন্যরকম মাদকতা।
একা একা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে নিজের শাড়ির আঁচলটা আঙুলে পেঁচাচ্ছিল এক অদ্ভুত রূপসী নারী। প্রথম দেখায় তাকে এই এলাকার কেউ বলে মনে হবে না—তার গায়ের রঙে কেমন যেন এক অপার্থিব, রূপালি আভা। সে আসলে সাধারণ কোনো মানুষ নয়, সুদূর গ্যালাক্সি থেকে আসা এক এলিয়েন, যে এই পৃথিবীতে এসে ভালোবেসে ফেলেছে/ পরকীয়া করতে এসেছে আমাদের এই সহজ-সরল কদম আলীকে। আর নিজের নাম দিয়েছে ‘এলিয়েন কদম আলী’।
ঠিক তখনই চারদিক তাকিয়ে চোরের মতো পা ফেলে ফেলে সেখানে এসে হাজির হলো আসল, রক্ত-মাংসের কদম আলী। তাকে দেখেই এলিয়েন কদম আলীর চোখে-মুখে এক তীব্র, গভীর অনুরাগ ফুটে উঠল। সেই চাহনিতে এক নিষিদ্ধ, পরকীয়া প্রেমের অমোঘ টান।
এলিয়েন কদম আলী:(একটু ঝুঁকে, ফিসফিসিয়ে, গলার স্বরে এক অদ্ভুত মায়া ঢেলে) "এত দেরি করলে কেন, কদম? আমি কতক্ষণ ধরে পোড়ো আমগাছটার নিচে তোমার জন্য দাঁড়িয়ে আছি, জানো? আমার গ্রহের নক্ষত্ররাজি পর্যন্ত তোমার অপেক্ষায় থমকে ছিল। তোমার ওই বসের ভ্যাটের খাতা কি আমার এই রূপালি ভালোবাসার চেয়েও বড় হলো?"
বাস্তব কদম আলী:(চারপাশে আড়চোখে তাকিয়ে, বুকের ভেতর ধকপুকানি সামলে) "আরে চুপ করো, রূপালি! কেউ দেখে ফেললে একেবারে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। আর বসের কথা বোলো না—বসের মাথায় এবার যা ভূত চেপেছে, তাতে আমার নিজেরই পাগল হওয়ার জোগাড়!
এলিয়েন কদম আলী:(কদম আলীর খুব কাছে এসে, তার কাঁধে আলতো করে হাত রেখে) "ওহ কদম! তুমি এখনো ওই সাধারণ মানুষের তৈরি অর্থহীন সংখ্যার জালে বন্দি হয়ে আছো? তোমার ওই বস তো একটা আস্ত পাগল! আটাশ বছর ধরে এক ভ্যাট আর ট্যাক্সের আইন নিয়ে ঘাঁটতে ঘাঁটতে ওনার মস্তিষ্কের নিউরনগুলো সব জট পাকিয়ে গেছে।
বাস্তব কদম আলী:(একটু দূরে সরে যাওয়ার ভান করে, কিন্তু মনে মনে এলিয়েন কদম আলীর এই নৈকট্য উপভোগ করে) "আরে রূপালি, বসের নামে এভাবে বলো না। বস তো বলছেন, এটা নাকি ‘সিস্টেম ট্রাস্ট’!
এলিয়েন কদম আলী:(খিলখিল করে হেসে উঠে, হাসির শব্দে যেন মহাকাশের তারা খসে পড়ার শব্দ) "কী বোকা তুমি, আমার কদম! এই জন্যই তো তোমার প্রেমে পড়ে আমি আমার গ্রহের রাজপ্রাসাদ ছেড়ে এই ধূলিময় পৃথিবীতে পড়ে আছি। শোনো, ভ্যাট আর ট্যাক্স হলো মানুষের তৈরি একটা জটিল মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদ। একটা রোবট বা কোডিং করা সিস্টেম কীভাবে মানুষের তৈরি পেঁচানো আইনের ভেতরের ফাঁকফোকর বুঝবে? তোমার বসের এই ‘প্রেডিক্টিভ অডিট ইঞ্জিন’ আসলে একটা মরীচিকা।
বাস্তব কদম আলী:(দীর্ঘশ্বাস ফেলে, এলিয়েন কদম আলীর চোখের গভীর মায়ায় ডুব দিতে দিতে) "তোমার কথা শুনলে মনে হয় দুনিয়ার সব ছেড়ে তোমার সাথেই চলে যাই, রূপালি। সত্যি বলতে, বসের এই নতুন আইডিয়া শুনে আমার নিজেরও মনে হচ্ছে বসের মাথাটা এবার পুরোপুরি গেছে! মানুষে মানুষে হিসাব মেলাতে পারে না, আর উনি নাকি এসআরও (SRO) আর আইনের ধারা রোবটের পেটে ঢুকিয়ে ‘লিটারেল ইন্টারপ্রিটেশন’ করাবেন!
এলিয়েন কদম আলী:(কদম আলীর আরও এক ধাপ কাছে এসে, তার চোখের দিকে তাকিয়ে) "একদম ঠিক ধরেছ, আমার প্রিয়। তোমার বস আসলে বাস্তব জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। উনি বুঝছেন না, আবেগ আর বুদ্ধি ছাড়া কোনো সিস্টেম টিকতে পারে না। আমাদের এই ভালোবাসা কোনো নিয়মের ফ্রেমে বাঁধা যায় না, তেমনই ভ্যাটের মতো জটিল জিনিস কোনো মেকানিক্যাল সফটওয়্যারে বন্দি করা যায় না।
বাস্তব কদম আলী:(মাথা চুলকে, একটু দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে) "কিন্তু রূপালি, বস তো আবার ওই ‘ট্রিপল হিট’ (Triple Hit) ফোরকাস্টারও বানিয়েছেন।
এলিয়েন কদম আলী:(তাচ্ছিল্যের সুরে, কদম আলীর চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে) "ওটা কনফিডেন্স নয় কদম, ওটা হলো চরম উন্মাদনা! মহাবিশ্বের ব্ল্যাক হোলের গতিপথ গণনা করা সহজ, কিন্তু মানুষের বাজারের ডলারের দাম আর সুদের হারের ওঠানামা আগে থেকে নিখুঁতভাবে বলা কোনো পৃথিবীর প্রযুক্তির পক্ষে সম্ভব নয়।
বাস্তব কদম আলী:(উত্তেজিত হয়ে) "হ্যাঁ! আমিও তো সেটাই ভাবছি! যদি কোনো কারণে ওই এআই সিস্টেম ভুল হিসাব দেয়, আর বড় কোনো কোম্পানির কোটি কোটি টাকার জরিমানা হয়ে যায়, তখন তো বসের এই নতুন লিমিটেড কোম্পানির ঘাড়েই সব দায় আসবে।
এলিয়েন কদম আলী:(মৃদু হেসে, কদম আলীর হাত দুটো নিজের রূপালি হাতের মুঠোয় নিয়ে) "তাহলে আর ওই পাগল বসের পেছনে সময় নষ্ট করছ কেন? যে মানুষটা নিজের চারপাশের বাস্তব জগত হারিয়ে একাকী হয়ে গেছে, যত সব উল্টো পাল্টা চিন্তা করে। আমার সাথে চল কোনো পাগলাটে বস নেই—আছে শুধু অন্তহীন প্রেম।"
বাস্তব কদম আলী:(এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, এলিয়েন কদম আলীর হাতের শীতল ও জাদুকরী স্পর্শে তার সারা শরীরে এক নিষিদ্ধ শিহরণ খেলে গেল। সে পোস্টারটার দিকে তাকাল, তারপর রূপালির দিকে তাকাল) "তুমি ঠিকই বলেছ, রূপালি। বস এবার সত্যি সত্যি সীমানা পেরিয়ে গেছেন। এমনি তো আইনের ডিগ্রি নাই, অভিজ্ঞতার যা আছে সেটা নিয়ে না থেকে নিজের ইচ্ছা মতো চলছে। লোকে আমাকে বসের বিশ্বস্ত কদম আলী বলুক আর যাই বলুক, আমি জানি—আমাদের বস এবার পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছেন!"
ঠিক তখনই বনের ভেতর শুকনো পাতার মচমচ শব্দ হতেই দুজনে ঝটকা দিয়ে দুদিকে সরে গেল। পরকীয়া প্রেমের সেই তীব্র, নিষিদ্ধ মুহূর্তটি বাতাসে মিলিয়ে গেল, কিন্তু কদম আলীর মনে বসের নতুন প্রজেক্টের বিরুদ্ধে এলিয়েন কদম আলীর ঢুকিয়ে দেওয়া সেই সন্দেহের বীজ আরও গভীরভাবে গেঁথে রইল।