
গ্রামের সেই বিশাল বটগাছটার নিচে কদম আলী বিড়ি শেষ করে সবেমাত্র একটা পান মুখে পুরেছেন, ঠিক তখনই আকাশের মেঘ ফুঁড়ে আবার নেমে এলো সেই থালার মতো মহাকাশযান। এবার আর ধোঁয়া নয়, বরং একটা ঝকঝকে রুপালি সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো ‘এলিয়েন কদম আলী’। তবে তার গায়ের সবুজ রঙটা এবার একটু ফ্যাকাসে, আর মাথার এন্টেনা দুটো কেমন যেন ঝুলে পড়েছে।
বাস্তব কদম আলী পানের পিক ফেলে চোখ বড় বড় করে তাকালেন।
বাস্তব কদম আলী: কী রে কসমিক দোসর! তুই আবার আইলি? ঘরের বউয়ের সিগন্যাল কড়া ছিল, মহাকাশ থেইকা তোরে তাড়া করছিল, এর মধ্যেই আবার পৃথিবীতে ল্যান্ড করলি যে? আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবরনেওয়ার মতো তোর এত শখ কেন রে ভাই?
এলিয়েন কদম আলী: (বটগাছের শিকড়ে ধপাস করে বসে) আর বোলো না কদম ভাই! ঘরের বউয়ের সিগন্যাল তো কোনোমতে ফাঁকি দিয়া আসছি। মহাকাশে যাওয়ার পর আমার মাথায় একটা চরম প্যাঁচ লাগছে। তুমি আগের দিন একটা কথা বলছিলা না—‘সাদা আয় আর কালো আয়’না এম, বিষয়টা কালো টাকা সাদা টাকা লেখা দেখলাম।
বাস্তব কদম আলী:( মুচকি হেসে, পানের চুনটা আঙুল দিয়ে গাছের গায়ে মুছতে মুছতে) ওরে আমার এলিয়েন বিজ্ঞানী রে! তুই তো দেখি মহাকাশ থেইকা আইছস কিন্তু বুদ্ধিতে পুরা মেন্দা মার্কা রয়ে গেলি। কথায় বলে না—যার কাজ তারে সাজে, অন্য লোকের লাঠি বাজে। মানুষ তার নিজের পাপের বোঝাটা টাকার ঘাড়ে চাপায়া দিয়া নিজে সাধু সাজতে চায়।
এলিয়েন কদম আলী:(এন্টেনা দুটো খাড়া করে) তার মানে? একটু পরকীয়ার ছন্দে বুঝায়া বলো না ভাই! পরকীয়ায় যেমন আসল প্রেমিক-প্রেমিকা আড়ালে থাকে, আর দোষ পড়ে ভাগ্যের বা পরিস্থিতির—এখানেও কি তেমন কিছু?
বাস্তব কদম আলী:একদম ঠিক ধরেছস! তুই তো দেখি পরকীয়ার লাইনে বেশ পাক্কা হইতাছস। শোন, পরকীয়া যখন কেউ করে, সে কি সবার সামনে আইসা বলে যে ‘আমি পরকীয়া করতাছি’? সে বলে, ‘আহা, আমরা তো শুধুই ভালো বন্ধু,এটা আমার অপরাধলব্ধ কালো আয়’, তবে সমাজ তাদের দিকে থুথু ফেলবে। কিন্তু যখন তারা বলে ‘আরে না, এটা জাস্ট একটু অপ্রদর্শিত কালো টাকা, ট্যাক্স দিলে সাদা হয়া যাবে।
এলিয়েন কদম আলী:(মাথা নেড়ে) ওহ! তার মানে ‘আয়’ বললে পেছনের উৎসটা খুঁজতে হয়—যেমন ঘুষ নাকি দুর্নীতি। আর ‘টাকা’ বললে শুধু নোটের বান্ডিলটা দেখা যায়! কিন্তু ভাই, এর সাথে পরকীয়ার ভাবটা কই?
বাস্তব কদম আলী:(চোখ টিপে) ভাবটা গভীর রে ভাই! মনে কর, তুই তোর ঘরের বউ ‘এলিয়েনী’রে ছ্যাঁকা দিয়া মঙ্গল গ্রহের ‘এলিনা’র সাথে ডেটিং করতে গেলি। এখন ধরা পড়ার পর তুই যদি বলিস, ‘আমি এলিনারে মন দিছি, তারে ভালোবাসি’—তবে তো তোর বউ তোরে জ্যান্ত কবর দিবে। কিন্তু তুই যদি চালাকি কইরা বলিস, ‘আরে বউ, আমি তো এলিনার সাথে শুধু একটু মহাকাশযানের তেল শেয়ার করছি, লেনদেনটা শুধু তেলের, মনের না!।
এলিয়েন কদম আলী:( সবুজ হাততালি দিয়ে) চমৎকার! অতি চালাকের গলায় দড়ি বলে যে মানুষের একটা প্রবাদ আছে, এটা তো তাদের জন্যই খাটে। কিন্তু কদম ভাই, এই যে ঢালাওভাবে কালো টাকা সাদা করার আইন তৈরি হয়, এতে কি টাকা নিজে কষ্ট পায় না?
বাস্তব কদম আলী:( দীর্ঘশ্বাস ফেলে) হ ভাই, টাকা সত্যিই কষ্ট পায়। একটা ১০০০ টাকার নোটের কথা চিন্তা কর। সেই নোটটা যখন একজন দিনমজুর রিকশাচালক তার রক্ত পানি করা খাটুনি দিয়া আয় করে, সেইটা হইলো খাঁটি সাদা আয়।
এলিয়েন কদম আলী:(বেদনার সুরে) আহা! এ তো দেখি সব শিয়ালের এক রা, চোর আর সাধু যদি একই লাইনে দাঁড়ায়, তবে মানুষ সৎ থাকবে কেন? আমাদের গ্রহে কেউ যদি অন্য কারো এনার্জি চুরি করে, তার এন্টেনা কেটে দেওয়া হয়। আর তোমাদের পৃথিবীতে চোরদের জন্য স্পেশাল ডিসকাউন্ট?
বাস্তব কদম আলী:(হাহাশেষ হেসে) আরে ভাই, আইনটা বানায় কারা? যারা আইন বানায়, তাদের অনেকের লুঙ্গির ভেতরেই তো ওই চুরির টাকা লুকানো থাকে। তারা নিজেদের বাঁচানোর জন্যই ‘কালো আয়’ শব্দটা মুখে আনে না।
এলিয়েন কদম আলী:কদম ভাই, আমার মনে একটা দুষ্টু বুদ্ধি আইতাছে। মানুষের এই যে পরকীয়া আর কালো টাকার স্বভাব, দুইটার মধ্যেই কিন্তু একটা মিল আছে। দুইটাই মানুষ লুকিয়ে করতে ভালোবাসে, আবার দুইটাতেই ধরা না পড়া পর্যন্ত সবাই নিজেকে ‘দুধে ধোয়া তুলসী পাতা’ মনে করে!
বাস্তব কদম আলী:(হেসে উঠে) সাবাশ! তুই তো দেখি পুরা মানুষ হয়া গেছস। আমাদের দেশে একটা কথা আছে—*ঠাকুর ঘরে কে, আমি কলা খাই না!* যখনই কালো টাকার কথা উঠবে, সে বলবে ট্যাক্স দিয়ে সাদা করেছি ভীম বার লাগিয়ে।
এলিয়েন কদম আলী:(আকাশের দিকে তাকিয়ে, তার এন্টেনায় আবার লাল আলো জ্বলতে শুরু করল) কদম ভাই, আমার যাওয়ার সময় হইয়া আইতাছে। তবে একটা প্রবাদ মাথায় আইতাছে—কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না**! মানুষ যতই আইন বানায়া ‘কালো টাকা’ সাদা করুক না কেন, তাদের মনের ভেতরের যে ‘কালো আয়’-এর দাগ, থেকে যায়।
বাস্তব কদম আলী:(বিড়িটা বাড়িয়ে দিয়ে, যদিও এলিয়েন খাবে না) তুই একটা খাঁটি কথা বলছস ভাই। আইন দিয়া কাগজের নোট সাদা করা যায়, কিন্তু বিবেকের কালো দাগ সাদা করা যায় না। মানুষের এই শব্দ নিয়ে খেলা করার ক্ষমতা হয়তো আছে, কিন্তু প্রকৃতির বিচার থেইকা বাঁচার ক্ষমতা নাই।
এলিয়েন কদম আলী বাস্তব কদম আলীকে একটা কসমিক সালাম ঠুকে মহাকাশযানে উঠে পড়ল। যানটি যখন তীব্র বেগে মহাশূন্যের দিকে ছুটে যাচ্ছিল, শালা এলিয়েন হইয়াও আমলাগো শব্দের চালাকি ধইরা ফেলল! আর আমাদের দেশের সাধারণ মানুষগুলা ‘কালো টাকা সাদা করার’ গল্প শুইনা হাততালি দেয়। আসলেই বোকারা বাঁচে খাতি, আর চালাকেরা লুটে হাতি।