
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়ে আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বড় এ বাজেটকে দেশের ইতিহাসের অন্যতম উচ্চাভিলাষী বাজেট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে এই বিশাল ব্যয় পরিকল্পনার অর্থায়নের বড় অংশ নির্ভর করবে পরোক্ষ কর, বিশেষ করে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) থেকে রাজস্ব আহরণের ওপর।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ কর্মসূচির শর্ত পূরণ, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্য সামনে রেখে বাজেটের রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।
এছাড়া ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও বাজেট পরিকল্পনায় গুরুত্ব পেয়েছে।
আগামী অর্থবছরের জন্য মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা এবং মূল বাজেটের তুলনায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা বেশি। এই রাজস্বের মধ্যে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব পড়তে পারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ দশমিক ২০ শতাংশ সমপরিমাণ রাজস্ব আহরণ করতে চায় সরকার।
সূত্র জানায়, রাজস্ব আহরণের প্রধান ভিত্তি হিসেবে আবারও বেছে নেওয়া হয়েছে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) খাত। শুধু ভ্যাট থেকেই ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে, যা মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার প্রায় অর্ধেক। পাশাপাশি আয়কর থেকে ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা এবং শুল্ক থেকে ৬৭ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত ভিত্তি থাকায় দ্রুত রাজস্ব বাড়ানোর সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর পথ হলো ভ্যাট। সেই কারণে আগামী অর্থবছরও পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বাড়তে যাচ্ছে।
আরও পড়ুন
ভ্যাটের আওতায় আসছে লক্ষাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান
অর্থনৈতিক সংকটের ধাক্কা রাজস্ব আদায়ে, ১০ মাসে ঘাটতি ১.০৪ লাখ কোটি টাকা
রাজস্ব আদায়ের যে জায়গাগুলো বাইরে ছিল সেগুলো আওতার মধ্যে এনেছি
তবে রাজস্ব আদায়ের বর্তমান চিত্র সরকারের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। অথচ একই সময়ের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। পুরো অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত লক্ষ্য ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা।
শুধু কর রাজস্ব নয়, করবহির্ভূত রাজস্ব আহরণেও পিছিয়ে রয়েছে সরকার। চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই খাতে আদায় হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা, যেখানে সংশোধিত লক্ষ্য ২০ হাজার কোটি টাকা। তবুও আগামী অর্থবছরে এই খাত থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, নন-ট্যাক্স রেভিনিউ (এনটিআর) খাত থেকে আগামী অর্থবছর ৬৬ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে। যদিও চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ খাতে আদায় হয়েছে ৩৭ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা।
সামগ্রিকভাবে চলতি অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের সংশোধিত লক্ষ্য ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা হলেও ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আদায় হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৯৩ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা। ফলে আগামী অর্থবছরের জন্য আরও বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ কতটা বাস্তবসম্মত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে।
ব্যয়ের বড় পরিকল্পনা
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নতুন অর্থবছরের বাজেটে দারিদ্র্যবিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরিচালন ব্যয়সহ অন্যান্য খাতে ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হতে পারে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হতে পারে ৩ লাখ কোটি টাকা।
বাজেটে ঘাটতি ধরা হতে পারে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এ ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফিরে আসতে পারে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ
রপ্তানি ও কৃষিখাতে বাড়তি কর, রপ্তানিকারকদের ওপর চাপ বাড়ার শঙ্কা
বাইক ও ব্যাটারি অটোরিকশা চালালেও দিতে হবে কর!
আগামী (২০২৬-২৭) অর্থবছরের বাজেটে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হতে পারে। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ধরা হতে পারে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকায় পৌঁছাবে বলে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে জোর
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নে সঠিক প্রকল্প নির্বাচন, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জনগণের দোরগোড়ায় উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, আর্থিক খাত পুনর্গঠনের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষি খাতে সহায়তা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও বাজেটের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
একই সঙ্গে ডিরেগুলেশন কার্যক্রম গ্রহণ, বিনিয়োগ পরিবেশের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং চলচ্চিত্র, সংগীত, ক্রীড়া ও গ্রামীণ সংস্কৃতিনির্ভর সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন
ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে মে মাসে রেমিট্যান্সে বড় উল্লম্ফন
সাংহাই পেরেছে, ঢাকাও চাইলে পারে
ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই
করব্যবস্থার সংস্কারের তাগিদ
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশের করব্যবস্থা এখনো অতিমাত্রায় পরোক্ষ করনির্ভর। দীর্ঘদিন ধরেই প্রত্যক্ষ কর, বিশেষ করে আয়কর ও সম্পদ করের অবদান বাড়ানোর কথা বলা হলেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। আয়করের আওতা বৃদ্ধি, করদাতার সংখ্যা বাড়ানো এবং কর পরিপালন নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন খাতের জন্য ভিন্ন ভিন্ন করপোরেট করহার বিদ্যমান। ব্যাংক, টেলিযোগাযোগ, তামাক, তৈরি পোশাক এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে আলাদা করহার থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান আইনসংগতভাবেই করের বোঝা কমিয়ে ফেলতে পারে। এতে একদিকে রাজস্ব ক্ষতি হয়, অন্যদিকে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।
বাংলাদেশের করব্যবস্থা এখনো মূলত পরোক্ষ করনির্ভর। আয়কর ও সম্পদ করের অবদান বাড়ানোর কথা দীর্ঘদিন ধরে বলা হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। বিভিন্ন খাতে ভিন্ন ভিন্ন করপোরেট করহার থাকায় রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি দুর্নীতির সুযোগও তৈরি হচ্ছে।— বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন
তবে তিনি সব খাতের জন্য একক করহার নির্ধারণকে বাস্তবসম্মত মনে করেন না। তার মতে, করহারের বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে কাঠামো সহজ করা উচিত। পাশাপাশি করনীতি ও কর প্রশাসনের সংস্কার জরুরি। কারণ জটিল করনীতি দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করে, আর দুর্বল জবাবদিহি সেই দুর্নীতি টিকিয়ে রাখে।
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যভিত্তিক করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে ভ্যাটভিত্তিক রাজস্ব আহরণ বাড়ানো দরকার। একই সঙ্গে মোট কর আয়ে প্রত্যক্ষ করের অংশও বাড়াতে হবে।
ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তবায়ন সক্ষমতা। বাজেটের আকার এমন হওয়া উচিত, যার অর্থায়ন বাস্তবে সম্ভব। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা যদি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে পুরো বাজেটই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। বর্তমান সরকার করজাল সম্প্রসারণের কিছু উদ্যোগ নিলেও, সেখান থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বড় অঙ্কের রাজস্ব আসার সম্ভাবনা কম। অন্যদিকে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক ব্যবস্থায় গভীর সংস্কারের সুফলও স্বল্পমেয়াদে পাওয়া যায় না।
এই প্রেক্ষাপটে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটকে তিনি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে রাজস্ব আহরণের বাস্তব সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তুলনামূলক ছোট ও বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট নেওয়া অধিক যুক্তিসংগত।
বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের চাপের মতো চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান উল্লেখ করে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, বড় বাজেট ঘাটতি সুদের হার, বিনিময় হার ও মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে আগামী বাজেটের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বাস্তবায়নযোগ্যতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, করজালের সীমাবদ্ধতা, কর ফাঁকি, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং রাজস্ব আহরণে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এরপরও আইএমএফের শর্ত পূরণ এবং রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকার রাজস্ব সংগ্রহে জোর দিচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, রাজস্ব আদায়ের সবচেয়ে সহজ পথ এখনো পরোক্ষ কর বা ভ্যাট। আর সেই কারণেই আগামী অর্থবছরের বিশাল বাজেট বাস্তবায়নেও প্রধান ভরসা হয়ে উঠছে ভ্যাটনির্ভর রাজস্বব্যবস্থা।