
গ্রামের শেষ মাথায়, শ্মশানঘাটের পাশের বটগাছটার নিচে বসে কদম আলী বিড়বিড় করছিল। সে কারো সাথে কথা বলছে না, গাছের পাতার সাথে বাতাসের যে কথোপকথন হয়, সেটাই সে বোঝার চেষ্টা করছে। এমন সময় আকাশে একটা নীল রঙের ঝিলিক দেখা গেল। শব্দ হলো না, শুধু বাতাসের গন্ধে একটা অদ্ভুত পোড়া রাবারের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ল। তারপর ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একজন মানুষ। অবিকল কদম আলী। কিন্তু তার পরনে লুঙ্গির বদলে রুপালি রঙের একটা আলখাল্লা, আর গলায় একটা অদ্ভুত যন্ত্র জ্বলছে-নিভছে।
বাস্তব কদম আলী (ব-ক) চোখ গোলগোল করে তাকাল। এলিয়েন কদম আলী (এ-ক) তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
ব-ক: “কি রে? তুই কোত্থেকে আইলি? তুই কি আমারই হারানো কোনো ভাই? নাকি আমার মাথার ভেতরে কোনো শয়তানি বুদ্ধি এখন শরীর নিয়ে বাইরে চইলা আইছে?”
এ-ক: “আমি তোমার হারানো ভাই নই, কদম আলী। আমি মহাকাশের ২১০ নম্বর গ্যালাক্সি থেকে আসছি। আমি ‘কসমিক কদম আলী’। মহাবিশ্বের সব কদম আলীদের রেকর্ড চেক করতে করতে তোমার কাছেই নামলাম। তুমি তো দেখি বেশ অদ্ভুত!”
ব-ক: “অদ্ভুত? আমি? আরে আমি তো এই গ্রামের সবচেয়ে সোজা মানুষ! আমি তো স্রোতের বিপরীতে হাঁটি, এইটাই তো সোজা পথ। তুই যে মহাকাশ থেকে আইলি, তোর ওখানে কি মানুষ আমার মতো পাগল আছে?”
এ-ক: “পাগল? পাগল তো তোমরা পৃথিবীতে। আমাদের ওখানে পাগলামি হলো সর্বোচ্চ বুদ্ধিবৃত্তি। যে যত বেশি অদ্ভুত কাজ করতে পারে, তাকে তত বড় বিজ্ঞানী বানানো হয়। আমি তো এইমাত্র একটা গ্রহের ওপর দিয়ে আসলাম, ওরা গোল্লা গোল্লা লাফায়। আমি ভাবলাম, পৃথিবী ঘুরে দেখি এরা কেন এত গম্ভীর হয়ে সব কাজ করে।”
ব-ক: “গম্ভীর? আরে ভাই, গম্ভীর হওয়ার সময় কই? আমার তো সারাদিন সময় কাটে পিঁপড়াদের সাথে আলাপ কইরা। তুই জানিস, পিঁপড়াদের নিজস্ব ব্যাংক আছে? ওরা চালের দানা জমা রাখে, বৃষ্টির দিনের জন্য। আর আমরা মানুষ? আমরা ভবিষ্যতের চিন্তা করতে করতে বর্তমানটাকেই গিলে ফেলি।”
এ-ক (তার অদ্ভুত যন্ত্রটা দিয়ে কদম আলীর গায়ের তাপমাত্রা মাপতে মাপতে): “তোমাদের মানুষেরা বড় অদ্ভুত। আমি দেখছি, তোমরা টাকা জমাচ্ছ, ঘর বানাচ্ছ। অথচ মরলে তো সাথে কিচ্ছু নিয়ে যাওয়া যায় না। আমাদের ওখানে আমরা শুধু আনন্দ আর রঙ জমাই। তোমার এই আনন্দটা কিসে, কদম আলী?”
ব-ক: “আমার আনন্দ? আমার আনন্দ হইলো, আমি নিজের জগতের সম্রাট। কেউ আমারে পাগল বলে, কেউ বলে মস্তিস্ক বিকৃত। কিন্তু আমি তো কারো ক্ষতি করি না। আমি যখন বটগাছতলায় বইসা থাকি, তখন আমার মনে হয় আমিই এই মহাবিশ্বের মালিক। তোর মহাকাশে কি বটগাছ আছে? গাছের সাথে কথা বলিস?”
এ-ক: “গাছ? না, আমাদের ওখানে গাছ নাই। আমাদের ওখানে সব লিকুইড। মানে তরল পাথর। আমরা কথা বলি কম্পনের মাধ্যমে। এই যে তুমি কথা বলছ, তোমার আওয়াজগুলো আমার কানে এসে ধাক্কা খাচ্ছে—এটা খুব মজার ব্যাপার! তোমরা কি সব সময় মুখ দিয়ে শব্দ বের করো? এটা তো বেশ কষ্টকর!”
ব-ক: “কষ্টকর? না তো! মুখ দিয়া কথা না কইলে পেট হালকা হয় ক্যামনে? তুই তো দেখি কিচ্ছু বুঝিস না। তোদের ওই গ্যালাক্সিতে কি খাওয়ার ব্যবস্থা নাই? তুই কি না খেয়েই আছিস?”
এ-ক: “আমরা খাই আলোক রশ্মি। সূর্যের আলো আর নক্ষত্রের ধুলো। তবে তোমার ওই যে মাটির চুলার ধোঁয়া বের হচ্ছে, ওইটা দেখে আমার খুব কৌতূহল হচ্ছে। ওটা কী? সাদা সাদা ধোঁয়া!”
ব-ক: “ওটা হইলো মুড়ি ভাজার ধোঁয়া। আর ওই যে কড়াইয়ের মধ্যে দেখছিস—ওটা হইলো আমার রাতের ডিনার। পান্তা ভাত আর কাঁচামরিচ। তুই তো আলোক রশ্মি খাস, তুই পান্তা ভাত হজম করতে পারবি তো? তোর পেটের ভেতর কি ব্ল্যাকহোল আছে?”
এ-ক (হেসে): “আমি শুধু পরীক্ষা করতে চাই। দেখি তো পৃথিবীর মানুষের খাদ্য কেমন।”
বাস্তব কদম আলী একটা মাটির সানকিতে করে পান্তা ভাত আর একটা শুকনো মরিচ পোড়া এলিয়েন কদম আলীর দিকে বাড়িয়ে দিল। এলিয়েন কদম আলী সেটা হাতে নিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে দেখল।
এ-ক: “এটা তো দারুণ একটা কেমিক্যাল স্ট্রাকচার! তোমরা এটা সরাসরি শরীরে দিচ্ছ? অকল্পনীয়!”
ব-ক: “শোন, তুই মহাকাশ থেকে আইছিস ঠিক আছে, কিন্তু পান্তা ভাত নিয়া টিপ্পনি দিবি না। এটা হইলো বাঙালির আত্মা। তোরা তো গ্যালাক্সিতে ঘুরিস, তোরা কি কখনো মাটির সোঁদা গন্ধ পাইছিস? বৃষ্টির পরে যখন মাটি ভেজে, তখন যে গন্ধটা বের হয়, সেই গন্ধটা কি তোর ওই লিকুইড পাথরের গ্রহে পাওয়া যায়?”
এ-ক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “না কদম আলী। আমাদের ওখানে কোনো গন্ধ নাই। আমাদের ওখানে কোনো অনুভুতিও নাই। আমি এই পৃথিবীতে আইসা অবাক হচ্ছি, তোমরা এত দুঃখ নিয়েও কীভাবে হাসো? তোমাদের তো কোনো বিশেষ ক্ষমতা নাই, তবু তোমরা কেন এত ঝগড়া করো? কেন তোমরা একে অপরের ভালো চাও না?”
ব-ক (একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে): “এটাই হইলো পৃথিবীর নিয়ম। মানুষ ভুলে গেছে যে সে এই মাটির অংশ। তারা নিজেকে মাটির উপরে বসাইছে। আমি তো আর ওসবের ধার ধারি না। আমি তো পাগল। পাগলদের কি কোনো নিয়ম আছে? আমি সকালে ঘুম থেকে উঠি আকাশের দিকে তাকাই, রাতে ঘুমাই জোনাকির আলো গুনে। আমার কোনো টেনশন নাই।”
এ-ক: “তোমার জীবনটা তো খুব হালকা! আমার গ্যালাক্সিতে সবাই খুব ভারী। আমাদের চিন্তার ওজন আমাদের গ্রহকে টেনে নামিয়ে দিচ্ছে। তোমার সাথে কথা বলে আমার মনে হচ্ছে, আমিও যদি একটু পাগল হতে পারতাম!”
ব-ক: “পাগল হওয়া তো কঠিন কিছু না রে ভাই। এই যে তুই আইলি, কেউ যদি তোরে এখন দেখে, তারা কি বলবে? তারা বলবে, ‘দেখ, আরেকটা কদম আলী আইছে!’ তারাও তোরে পাগল বলবে। তাহলে তুই আর আমি একই দলে নাম লেখাইলি।”
এ-ক: “হা হা হা! তুমি তো একদম ঠিক বলেছ। আমি তাহলে এখন থেকে পৃথিবীর ‘অফিসিয়াল পাগল’ হিসেবে নিজের রেজিস্ট্রেশন করতে চাই।”
ব-ক: “আরে না, রেজিস্ট্রেশন করার দরকার নাই। পাগল হওয়ার জন্য কোনো অফিসের দরকার হয় না। মনের জানালাটা খুইলা দিতে হয়। তুই এক কাজ কর, কালকে সকালে আমার সাথে নদীর পাড়ে যাবি। দেখবি, মাছেরা কীভাবে পানির নিচে ড্যান্স করে। মানুষ ওটা দেখে না, মানুষ শুধু বড়শি ফেলার চিন্তা করে।”
এ-ক: “ঠিক আছে! আমি কালকের সকালটা দেখতে চাই। আমি আমার মহাকাশযানের ইঞ্জিনের গিয়ার নিউট্রাল করে দিয়েছি। এখন আর আমি মহাকাশের কদম আলী না, এখন আমি এই গ্রামেরই আরেকটা অদ্ভুত কদম আলী।”
ব-ক: “সাবাস! চল, এখন পান্তা ভাতটা শেষ কর। তারপর আমরা চাঁদটাকে নিয়ে একটু গবেষণা করব। আমার মনে হয় চাঁদের বুড়ি আসলে একা থাকে না, সে আমাদের মতো বন্ধুদের খোঁজ করে।”
এ-ক: “একদম ঠিক বলেছ। চল!”
অন্ধকার রাতের নিচে, গ্রামের বটগাছতলায় তখন পৃথিবীর মাটির কদম আর মহাকাশের কদম আলী একসাথে বসে পান্তা ভাত খাচ্ছে। তাদের হাসির শব্দে শ্মশানঘাটের নীরবতা ভেঙে খানখান হয়ে গেল। পৃথিবীটা অদ্ভুত সুন্দর, যদি কেউ সেটাকে দেখার মতো অদ্ভুত চোখ নিয়ে তাকাতে পারে।