
পরদিন ভোরবেলা। ভোরের আলো এখনো পুরোপুরি ফোটেনি, কুয়াশার চাদরে ঢাকা নদীপাড়ে দুই কদম আলী বসে আছে। বাস্তব কদম আলীর পরনে সেই পুরোনো ময়লা পাঞ্জাবি, আর এলিয়েন কদম আলী (এ-ক) তার রুপালি আলখাল্লা লুকিয়ে একটা পুরনো ছেঁড়া গামছা মাথায় বেঁধে রেখেছে। তার মতে, এটাই পৃথিবীর ‘গ্রাম্য ছদ্মবেশ’।
বাস্তব কদম আলী (ব-ক) আকাশের দিকে তাকিয়ে এক চিমটি বাতাস টেনে নিল। “বুঝলি এ-ক, ভোরবেলাটা হইলো পৃথিবীর ‘রিবুট’ হওয়ার সময়। রাতে মানুষ যা কিছু ভুল করে, সকালবেলা প্রকৃতি তা ধুয়েমুছে সাফ করে দেয়।”
এলিয়েন কদম আলী (এ-ক) তার চোখে একটা অদ্ভুত লেন্স বসিয়ে সূর্যোদয় দেখছে। “আমি বুঝতে পারছি না, কদম। তোমরা কেন প্রতিদিন এই একই গোল বলটার জন্য এত আবেগপ্রবণ হও? আমাদের গ্যালাক্সিতে আমরা সূর্যের শক্তি সরাসরি ব্যাটারিতে নিই, কিন্তু তোমরা কেন এই আলো দেখে এত খুশি হও?”
ব-ক: “আরে বোকা, আমরা তো শুধু আলো নিই না, আমরা আলোটা গায়ের চামড়ায় মাখি। তুই তো রোবট না যে শুধু শক্তি দিলেই হবে। তোরা কি কখনো ঘাসের ওপর শিশির পড়ে থাকতে দেখেছিস? ওই যে মুক্তার মতো জ্বলছে? ওটার কোনো দাম আছে? নাই। কিন্তু ওইটা দেখলে মনে হয় পৃথিবীটা কত দামী!”
এ-ক একটা শিশিরবিন্দু হাত দিয়ে ছুঁতে গেল, কিন্তু আঙুল দিয়ে চাপ দিতেই সেটা গলে গেল। সে অবাক হয়ে দেখল, “কদম, এটা তো ধ্বংস হয়ে গেল! আমি তো শুধু পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম।”
ব-ক হেসে উঠল। “এটাই তো জীবন, রে ভাই। যা কিছু সুন্দর, তা ধরে রাখার চেষ্টা করলেই হাত থেকে গলে যায়। তোরা তোদের গ্রহের সব কিছু শক্ত পাথরের মতো বানিয়ে রেখেছিস, তাই তোরা কোনো কিছু অনুভব করতে পারিস না। আমরা এখানে প্রতিদিন মরে যাই, আবার প্রতিদিন বেঁচে উঠি।”
ঠিক তখনই পাশের ঝোপ থেকে একটা শিয়াল ডেকে উঠল। এ-ক সাথে সাথে একটা যন্ত্র বের করে সেটার অনুবাদ করার চেষ্টা করল। “কদম! শিয়ালটা বলছে— ‘ভোর হয়েছে, মুরগিগুলো এখনো ঘুমিয়ে, আমি কি যাব?’ এটা কি কোনো সামরিক বার্তা?”
ব-ক পেটে হাত দিয়ে হাসতে শুরু করল। “না রে ভাই! ও বলছে, ‘রাতের বেলাটা বেশ ভালো ছিল, এখন একটু রোদে গা সেঁকে নিই।’ তোরা মহাকাশের মানুষরা সবকিছুতে ষড়যন্ত্র কেন খোজিস? সব সময় কি কিছু পাওয়ার বা হারানোর অংক থাকে? এই তো নদীটা—সে কি জানে সে কোথায় যাচ্ছে? সে তো শুধু বয়ে যাচ্ছে। এই বয়ে যাওয়াই তো আনন্দ।”
এ-ক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। সে তার আলখাল্লার বোতামটা ঠিক করতে করতে বলল, “জানেন কদম, আমাদের গ্রহে আমরা সবসময় ‘এফিসিয়েন্সি’ বা কর্মদক্ষতা নিয়ে থাকি। মানে—সবচেয়ে কম সময়ে কীভাবে সবচেয়ে বেশি কাজ করা যায়। কিন্তু তোমাদের এই ‘বসে থাকা’, এই ‘অলস সময় কাটানো’—এটা তো মহাবিশ্বের হিসেবে অপচয়। কিন্তু তোমাদের সাথে এই দুই দিন কাটিয়ে আমার মনে হচ্ছে, আমাদের অপচয়ই আসলে সবথেকে বড় বিনিয়োগ।”
ব-ক পানির ঝাপটা দিল নদীতে। “দেখ, মাছগুলো লাফ দিচ্ছে। ওরা কি কোনো ডিউটি পালন করছে? না। ওরা লাফ দিচ্ছে কারণ ওরা বেঁচে আছে। এই বেঁচে থাকাটাই আসল কাজ। বাকি সব তো শুধু বেঁচে থাকার মাধ্যম। তুই আজ সারাদিন আমার সাথে থাকবি। আমরা কোনো কাজ করব না। শুধু দেখব, শুনব আর নিঃশ্বাস নেব।”
এ-ক মাথা দোলাল। “ঠিক আছে। আমি আমার মহাকাশযানের সেন্সরগুলো বন্ধ করে দিলাম। এখন থেকে আমি শুধু পৃথিবীর কদম আলী।”
সেটা ছিল অদ্ভুত এক দৃশ্য। পৃথিবীর সবচেয়ে পাগল মানুষ আর মহাকাশের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী সত্তা—উভয়ে মিলে নদীর ধারে এক জটলা পাকিয়ে বসে আছে। এলিয়েন কদম আলী একটা শুকনো পাতাকে হাতে নিয়ে দেখছে, আর বাস্তব কদম আলী তাকে শেখাচ্ছে কীভাবে পাতার শিরা দেখে বাতাসের গতিপথ বুঝতে হয়।
বিকালবেলা যখন আকাশটা কমলা রঙের হলো, এ-ক বলল, “কদম, একটা প্রশ্ন ছিল। তোমরা মানুষরা ভালোবাসো কেন? আমি দেখলাম, তোমরা একে অপরের জন্য জীবন দাও, আবার একে অপরের ক্ষতি করো। এটা তো খুব কনফিউজিং!”
ব-ক ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল। “ভালোবাসা হইলো ‘পাগলামি’রই আরেক নাম, এ-ক। যখন তুই নিজেকে নিজের চেয়ে বেশি অন্য কারো মাঝে খুঁজে পাবি, তখনই সেটা ভালোবাসা। এটা কোনো অংক না, এটা একটা ঘোর। তুই যদি ঘোর পছন্দ করিস, তবে তুই মানুষ। তুই যদি শুধু অংক করিস, তবে তুই মেশিন।”
এ-ক আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল, যা তার গ্রহে অসম্ভব ছিল। সে আস্তে করে বলল, “আমি বোধহয় এবার একটু একটু করে ‘মানুষ’ হতে পারছি। আমার বুকের ভেতরে কেমন জানি একটা অদ্ভুত স্পন্দন হচ্ছে।”
ব-ক হেসে বলল, “ওটাই ভালোবাসা, বন্ধু! ওটাই ভালোবাসা। চল, এবার চাঁদ ওঠার অপেক্ষায় বসি। চাঁদের সাথে আমাদের অনেক কথা বাকি আছে।”
দুই বন্ধু, দুই জগত থেকে আসা দুই পথিক—অন্ধকার নামার আগে নদীর পাড়ে আবার নিজেদের এক নতুন পৃথিবী গড়ে তুলল। যেখানে কোনো নিয়ম নেই, কোনো লক্ষ্য নেই—শুধু আছে একসাথে থাকার এক গভীর, অটল প্রশান্তি। এই পাগলদের পৃথিবীতে কেউ নেই, আবার সবাই আছে। এটাই তো জীবনের আসল বিলাসিতা।