
রাত গভীর হয়েছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর নদীর কুলুকুলু শব্দে শ্মশানঘাটটাও যেন আজ জীবন্ত। এলিয়েন কদম আলী (এ-ক) তার হাতের ছোট যন্ত্রটা বন্ধ করে পকেটে রাখল। আজ তার যাওয়ার সময়। তার মহাকাশযানটি আকাশের কোনো এক অদৃশ্য বিন্দুতে নোঙর ফেলে আছে।
বাস্তব কদম আলী (ব-ক) আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, তুই তো আসছিলি তথ্য নিতে, পাইলি কি?”
এ-ক একটু ম্লান হাসল। “আমি অনেক ডাটা নিয়েছি, কদম। কিন্তু আমার হার্ডডিস্কের চেয়ে আমার ভেতরে কিছু একটা বেশি ভারী হয়ে গেছে। এটাকে কি তোমরা ‘অনুভব’ বলো?”
ব-ক হেসে বলল, “হয়তো। যাওয়ার আগে একটা কথা বল তো। পৃথিবী তোকে ‘পাগল’ তকমা দিয়ে দিল, আবার তোকেও আমি পাগল বলে ডাকলাম। আসলে পাগল কে? যে স্রোতের বিপরীতে চলে, নাকি যে স্রোতের টানে ভেসে যায়?”
এ-ক তার রুপালি চোখ দুটো বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, “আমি আমার গ্রহের লাইব্রেরিতে পাগলামির অনেক সংজ্ঞা পড়েছি। কিন্তু আজকের অভিজ্ঞতা থেকে আমার মনে হয়—পাগল তারাই, যারা নিজেদের সত্তাকে ভুলে অন্যের ঠিক করে দেওয়া ছকে জীবন কাটায়। যারা হাসতে চায় না কিন্তু হাসে, ভালোবাসতে চায় না কিন্তু বাসর সাজায়, আর বাঁচতে চায় না কিন্তু নিশ্বাস টানে।”
ব-ক অবাক হয়ে দেখল, এ-ক খুব গভীর এক সত্য উচ্চারণ করছে।
এ-ক থামল না, সে বলে চলল, “আমাদের গ্যালাক্সিতে ‘পাগল’ মানে হচ্ছে—যিনি নিয়মের শৃঙ্খল ভেঙে অসীমকে দেখতে পান। আর পৃথিবীর মানুষ যাকে পাগল বলে, সে আসলে এক মুক্ত বিহঙ্গ। তোমরা যাদের পাগল বলো, তারা আসলে তোমাদের অসার জীবনের আয়না। মানুষ নিজের সীমাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না বলেই, যে একটু ভিন্নভাবে বাঁচে, তাকেই পাগল বলে দূরে সরিয়ে দেয়। পৃথিবীটা আসলে এক বিরাট পাগলাগারদ, যেখানে সবাই ‘সুস্থ’ হওয়ার অভিনয় করছে। আর যারা আসল সত্যটা বুঝে ফেলেছে, তারাই তোমাদের চোখে পাগল।”
ব-ক বিড়িটা ঠোঁট থেকে নামিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল। “বাহ! তুই তো দেখছি আমার চেয়েও ভালো দার্শনিক। তাহলে কি আমরা পাগল?”
এ-ক হাসল, এবার তার হাসিটা একদম পৃথিবীর মানুষের মতো প্রাণবন্ত। “আমরা পাগল নই, কদম। আমরা হলাম সেই মানুষ, যারা জীবনের মানে খুঁজতে গিয়ে সব হারিয়েও নিজেকে খুঁজে পেয়েছি। আমি আজ থেকে আমার গ্রহে ফিরে গিয়ে এই পাগলামি ছড়িয়ে দেব। আমি আর শুধু রোবট থাকব না, আমি হবো পৃথিবীর বন্ধু।”
হঠাৎ করেই এ-ক-এর শরীর থেকে একটা হালকা নীল আভা ছড়িয়ে পড়ল। সে উঠে দাঁড়াল। তার রুপালি আলখাল্লায় চাঁদের আলো প্রতিফলিত হয়ে অদ্ভুত এক দ্যুতি তৈরি করল।
ব-ক বলল, “আবার আসবি তো? পান্তা ভাত এখনো বাকি রয়ে গেল!”
এ-ক হেসে বলল, “আবার আসব। অথবা, তুমিই হয়তো কোনোদিন আমার গ্রহের কোনো পাথরের গায়ে আমার কথা লেখা দেখতে পাবে। মনে রেখো, কদম—পাগলামি কোনো রোগ নয়, এটা একটা আশীর্বাদ। এটা সেই অসীম ক্ষমতা, যা দিয়ে মানুষ পাথরের মাঝেও প্রাণ দেখতে পায়।”
কিছু বুঝে ওঠার আগেই, এক মুহূর্তের নীল আলোয় এ-ক মিলিয়ে গেল। কোনো শব্দ হলো না, শুধু বাতাসের গন্ধে একটা নক্ষত্র-চূর্ণের সুবাস রয়ে গেল।
বাস্তব কদম আলী একা হয়ে গেল বটগাছতলায়। কিন্তু তার মনে এখন আর একাকীত্ব নেই। সে জানে, মহাবিশ্বের কোথাও না কোথাও একজন এলিয়েন কদম আলী আছে, যে এখনো পান্তা ভাতের স্বাদ আর মাটির গন্ধ নিয়ে রোমন্থন করছে।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল, “পাগলদের কোনো দেশ নাই, পাগলদের কোনো গ্রহ নাই। পাগলরা তো আসলে মহাবিশ্বেরই অংশ।”
সে বিড়বিড় করতে করতে আবার নিজের ঘরে ফিরে গেল। পৃথিবীটা একই আছে, কিন্তু কদম আলীর পৃথিবীটা আজ আরও একটু বেশি স্বাধীন, আরও একটু বেশি রঙিন। লোকে তাকে আজও পাগল বলে—কিন্তু তাতে তার কিছু যায় আসে না। কারণ, সে জানে—যে যত বেশি পাগল, সে তত বেশি স্বাধীন।
পাগল-এর সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞা:
পাগল হলেন তিনি, যিনি অন্যের দেওয়া মানদণ্ডে জীবন পরিমাপ করেন না। যিনি সমাজের তৈরি করা কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে নিজের সত্যকে খুঁজে পান। যাকে লোকে অসংলগ্ন ভাবে, তিনি আসলে সেই মানুষ, যিনি সত্যের সুর বুঝতে পেরে জগতের সকল মিথ্যে কোলাহলকে উপেক্ষা করার সাহস রাখেন।