
শ্মশানঘাটের সেই পুরনো বটগাছটির নিচে আজও অন্ধকার ঘন হয়ে নেমেছে। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আগের মতোই, শুধু নদীর বাতাসে আজ একটু অন্যরকম আদ্রতা। বাস্তব কদম আলী (ব-ক) বিড়িটা ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছিল। তার মনটা গত দুদিন ধরে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে ছিল। সেই এলিয়েন কদম আলীর (এ-ক) কথা, তার দেওয়া সেই নতুন দর্শনের সংজ্ঞাগুলো বারবার তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। হঠাৎ, কোনো শব্দ ছাড়াই চারপাশটা হালকা নীল আলোয় ভরে গেল। কদম আলী চমকে উঠে দেখল, ঠিক দুদিন আগের সেই পরিচিত অবয়ব—এ-ক—তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার রুপালি আলখাল্লায় নক্ষত্রের ধুলো লেগে আছে কি নেই, তা বোঝার উপায় নেই, তবে সে আগের মতোই শান্ত।
ব-ক বিড়ির ধোঁয়াটা বাতাসে মিলিয়ে যেতে দেখল। মৃদু হেসে বলল, “এসেছিস? ভেবেছিলাম আমার ভ্রম।”
এ-ক ব-ক-এর পাশে এসে বসল। তার রুপালি চোখ দুটো দিয়ে সে গভীর এক দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর এ-ক হঠাৎ বলল, “কদম, গত দুইদিন আমি তোমাদের পৃথিবীর মানুষের যাতায়াত, তাদের কর্মস্থল আর আড্ডার জায়গাগুলো পর্যবেক্ষণ করলাম। মানুষ অদ্ভুত প্রাণী। তারা একা থাকতে ভয় পায়। এক মুহূর্তের জন্য তারা নীরবতা সহ্য করতে পারে না। সারাক্ষণ কতশত বন্ধু, কতশত আড্ডা, কত মানুষের ভিড়—সবকিছুতেই এক ধরনের তাড়াহুড়ো। কিন্তু তুমি? তুমি কেন একদম একা? তোমার তো কোনো বন্ধু নেই, কোনো আড্ডা নেই। সবাই তোমাকে এড়িয়ে চলে কেন?”
ব-ক একটু করুণ হাসল। তার হাসিটা ছিল শ্মশানের ধোঁয়ার মতোই ধূসর। সে বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে বলল, “বন্ধুত্ব? পাগলের সাথে কি কেউ বন্ধুত্ব করে, এ-ক? পৃথিবীটা অদ্ভুত। এখানে সবাই বন্ধু খোঁজে স্বার্থের প্রয়োজনে, অথবা একঘেয়েমি কাটানোর জন্য। আমার জীবনটা তো এক অসমাপ্ত অংকের মতো। আমি যখন সত্য কথা বলি, তখন তারা ভাবে আমি নেশা করেছি। যখন আমি নিয়ম ভাঙি, তারা ভাবে আমার মাথায় গোলমাল আছে। পাগলদের সাথে বন্ধুতা করলে তো নিজের ‘সুস্থ’ সমাজে মানসম্মান থাকে না। মানুষ চায় না পাগলদের সাথে নিজের নাম জড়াতে।”
এ-ক কৌতূহলী দৃষ্টিতে ব-ক-এর দিকে তাকাল। “আমি তো তোমার পাগলামিতে কোনো অসংলগ্নতা দেখি না, কদম। আমি যা দেখি, তা হলো এক গভীর নিস্তব্ধতা। কিন্তু মানুষের এই যে তথাকথিত বন্ধুত্ব—তুমি কি সত্যিই মনে করো ওগুলো বন্ধুত্ব? আমি দেখলাম, মানুষ আড্ডায় হাসে, গালগল্প করে, কিন্তু কেউ কারো চোখের দিকে তাকালে তার ভেতরের শূন্যতা দেখতে পায় না। তারা একে অপরের সাথে কথা বলে শব্দ বিনিময়ের জন্য, হৃদয়ের জন্য নয়। এই ভিড়ের মাঝে তুমি যে একা আছো, এটা কি তোমার ব্যর্থতা, নাকি তোমার শক্তি?”
ব-ক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তোর কাছে এটা শক্তি মনে হতে পারে, কিন্তু পৃথিবীতে একে বলে বিচ্যুতি। সমাজ চায় সবাই ভেড়ার পালের মতো চলবে। যে একটু ভিন্নভাবে চিন্তা করে, তাকেই তারা তকমা দেয়—পাগল। আমি ছোটবেলা থেকে দেখেছি, সত্য বলাটা এখানে একটা বিলাসিতা। লোকে চায় তাদের মিথ্যে শুনতে। মিথ্যে শোনাতে হলে অনেক বন্ধু লাগে, অনেক আড্ডা লাগে। আমার কাছে সেই মিথ্যে নেই। তাই আমার কোনো বন্ধুও নেই। আমি কি তবে সত্যি পাগল নই?”
এ-ক হালকা করে হাসল। তার হাসিটা অনেকটা ঝরনাধারার শব্দের মতো। “তোমার সংজ্ঞায় পাগল সে, যে মিথ্যে বলতে পারে না। আর আমার সংজ্ঞায় পাগল সে, যে ভিড়ের মাঝেও নিজেকে হারিয়ে ফেলে। তুমি তো নিজেকে খুঁজে পেয়েছ। তুমি যাকে একাকীত্ব বলছ, আমি তাকে দেখছি ‘সমৃদ্ধি’ হিসেবে। তুমি কি জানো, মহাবিশ্বের সবচেয়ে বুদ্ধিমান নক্ষত্রগুলোও মহাকাশের অন্ধকারেই জ্বলে? তাদের সঙ্গী নেই, কিন্তু তারা পথ দেখায়। তুমি কি তবে অন্ধকারকে ভয় পাচ্ছ?”
ব-ক বিড়িটা নিভিয়ে ফেলল। “ভয়? না। কিন্তু কখনো কখনো খুব ইচ্ছে হয়, কেউ যদি আমার মনের ভাষাটা বুঝত! কেউ যদি একবার বলত—‘কদম, তুই যা ভাবছিস, সেটা ভুল নয়।’ সবাই বলে, ‘কদম, তুই যা করছিস, তা সমাজবিরোধী।’ এই যে প্রতিদিনকার সমাজবিরোধী তকমা, এটা বইতে বইতে মাঝে মাঝে ক্লান্তি আসে।”
এ-ক একটু এগিয়ে এল। তার হাতটা ব-ক-এর কাঁধে রাখল। যদিও তার স্পর্শে কোনো রক্ত-মাংসের উষ্ণতা নেই, কিন্তু এক অদ্ভুত প্রশান্তি বয়ে গেল ব-ক-এর শরীর দিয়ে। এ-ক ধীরস্বরে বলল, “মানুষের বন্ধুত্ব হলো একধরনের আশ্রয়। তারা একে অপরের দোষ ঢাকার জন্য বন্ধুত্ব করে। কিন্তু তুমি তো দোষ ঢাকতে চাও না, তুমি তো সত্যকে উন্মোচন করতে চাও। সত্যের কোনো বন্ধু নেই, কদম। সত্য নিজেই নিজের একাকী সঙ্গী। আমি যখন আমার গ্রহে ফিরে যাব, তখন আমার গ্রহেও তোমার এই একাকীত্বের কথা বলব। ওরা জানবে, পৃথিবীর কোনো এক কোণে একজন মানুষ আছে, যে নিজেকে নিঃস্ব করেও সত্যকে আঁকড়ে ধরে আছে।”
ব-ক মাথা নিচু করে রইল। সে বুঝতে পারল, সে আসলে একা নয়। তার লড়াইটা একা নয়। পৃথিবী তাকে পাগল বলুক, তাতে তার আর আপত্তি নেই। সে আকাশের বিশালতার দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর সাথে এই আড্ডাটা কি বন্ধুত্ব নয়, এ-ক? আমি তো কোনোদিন ভাবিনি, কোনো মহাজাগতিক প্রাণীর সাথে আমার এত ভালো বন্ধুতা হবে। হয়তো তুই ঠিকই বলেছিস—বন্ধুত্ব মানে ভিড় নয়, বন্ধুত্ব মানে হলো সুরের মিল।”
এ-ক উঠে দাঁড়াল। তার শরীর থেকে আবারও সেই নীল আভা ছড়িয়ে পড়ল। সে মৃদু স্বরে বলল, “তুমি পাগল নও, কদম। তুমি মহাবিশ্বের সেই সব বিরল মানুষদের একজন, যারা ভিড়ের কোলাহল ছেড়ে নিজের ভেতরের মিউজিক শুনতে পায়। যে নিজের সুর নিজে তৈরি করতে পারে, তার বন্ধুর প্রয়োজন হয় না। সে নিজেই একটা আস্ত পৃথিবী। ভালো থেকো, বন্ধু। তোমার এই পাগলামি যেন কোনোদিন শেষ না হয়।”
ব-ক দাঁড়িয়ে পড়ল। সে অনুভব করল, তার চারপাশের শ্মশানঘাটটা আর ভয়ের জায়গা নয়, এটা এখন এক মুক্ত চিন্তার ক্ষেত্র। লোকে তাকে আজও পাগল বলে ডাকবে, কিন্তু সেই তকমাটা এখন তার কাছে মেডেলের মতো মনে হচ্ছে। সে দেখল, এ-ক মিলিয়ে যাচ্ছে নক্ষত্রের ধুলোয়। তার মনে হলো, পৃথিবীতে হাজারো বন্ধু থাকার চেয়ে মহাবিশ্বের কোনো এক কোণে একটি খাঁটি আত্মা পাওয়া ঢের ভালো।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “যাও বন্ধু। আবার দেখা হবে। ততদিনে হয়তো আমি আরও একটু বেশি পাগল হয়ে উঠব—পৃথিবীর চোখে পাগল, কিন্তু নিজের কাছে মুক্ত।”
রাতের নিস্তব্ধতায় কদম আলী একা হয়ে রইল না। সে বুঝতে পারল, বন্ধুত্ব শুধু মাটির পৃথিবীতে নয়, বন্ধুত্ব আত্মার স্পন্দনে। আর সে স্পন্দন যেখানেই থাকুক, তা কদম আলীকে খুঁজে নেবেই। পৃথিবীটা যেমন ছিল, তেমনই রইল। কিন্তু কদম আলীর একাকীত্বটা আজ এক অদ্ভুত পূর্ণতায় ভরে গেল। সে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল, গুনগুন করে গাইছে এক অজানা সুর, যা শুধু সেই শুনতে পায়—যে পাগল।