
বাইরে তীব্র রোদ আর ট্রাফিকের হর্ন। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে এলিয়েনের কথার রেশ ধরে বাস্তব কদম আলী আবার প্রশ্ন করল।
বাস্তব কদম আলী: (একটু নড়েচড়ে বসে) এলিয়েন ভাই, তুমি ঠিকই বলছ ব্যবসায়ীদের একাংশের মধ্যে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা আছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো—আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা কি আসলেই নিজেরা জানেন যে তারা ঠিক কী পরিমাণ কর বা ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছেন, নাকি পুরো সিস্টেমটাই এমন এক ঘূর্ণাবর্তে তৈরি যে চাইলেও কেউ বুঝতে পারে না সে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? আর যদি তারা জেনেই থাকেন, তবে এনবিআরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা আসার খবরে উনাদের মনে এত তীব্র ভয় কেন কাজ করে? বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে হিসাব বুঝিয়ে দেওয়ার সাহস কেন পান না?
এলিয়েন: (মহাজাগতিক নখ দিয়ে টেবিলে হালকা টোকা দিয়ে মৃদু হেসে) কদম, তোর এই প্রশ্নটাই হলো তোদের অর্থনৈতিক সংস্কৃতির মূল রহস্য। শোন, তোদের দেশের ব্যবসায়ীদের বড় একটা অংশ খুব ভালো করেই জানে যে তারা কী পরিমাণ ফাঁকি দিচ্ছে। তবে সেই ফাঁকিটা সবসময় শুধু নিয়মনীতি ভেঙে পকেটে টাকা ভরার নয়; বহু ব্যবসায়ী জানে যে, আইনগুলো এতটাই জটিল, পরস্পরবিরোধী এবং অবাস্তব যে, শতভাগ সততার সাথে ব্যবসা চালাতে গেলে লাভ তো দূরের কথা, পুঁজি বাঁচানোই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
বাস্তব কদম আলী: (চোখ কপালে তুলে) বলিস কী! আইন কি তবে ব্যবসায়ীদের ফাঁকি দিতে বাধ্য করে?
এলিয়েন: পরোক্ষভাবে হ্যাঁ! আইন ও মাঠের বাস্তবতার দূরত্ব এত বেশি যে, আইনের মারপ্যাঁচ আর ত্রুটিপূর্ণ বিধানগুলো নিজেই একধরনের চোরাবালি তৈরি করে রেখেছে। ব্যবসায়ীরা জানে যে, তাদের হিসাবে কোথাও না কোথাও ঘাটতি বা ফাঁকফোকর রয়েই গেছে। আর এই ‘জানার’ অনুভূতিটাই তাদের মনে অপরাধবোধ ও চরম ভয়ের জন্ম দেয়। তারা জানে, কাগজে-কলমে শতভাগ নিখুঁত হিসাব বের করা প্রায় অসম্ভব।
বাস্তব কদম আলী: তাহলে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা বা পরিদর্শকদের নাম শুনলে যে বুক কাঁপে, সেটার মূল কারণ কি তবে এই অভ্যন্তরীণ অপরাধবোধ?
এলিয়েন: ঠিক তাই, কদম! চোর বা অপরাধী যখন জানে যে তার ঘরে চোরাই মাল বা ত্রুটি আছে, তখন পাহারাদার লাঠি নিয়ে গেটে দাঁড়ালেই তার বুক কাঁপবে—এটাই স্বাভাবিক। তোদের দেশের ব্যবসায়ীরা যখন দেখে যে কোনো নিয়মমাফিক পূর্বানুমতি ছাড়াই একজন সাধারণ কর কর্মকর্তা এসে গুদাম বা সার্ভার চেক করার ক্ষমতা পেয়ে গেছে, তখন তাদের আত্মা কেঁপে ওঠে। কারণ তারা জানে, ওই কর্মকর্তা এসে যদি সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর অসংগতি খুঁজতে শুরু করে, তবে আইন অনুযায়ী কাউকে বাঁচানো যাবে না। ভয়টা নিয়মের নয়, ভয়টা হলো ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির সুযোগে ওই কর্মকর্তার হাতে বন্দি হয়ে যাওয়ার।
বাস্তব কদম আলী: কিন্তু ভাই, কর-অনুগত বা সৎ ব্যবসায়ীরা কেন ভয়ে গুটিয়ে থাকে? তারাও তো সমানভাবে আতঙ্কিত হয়!
এলিয়েন: কারণ তোদের সিস্টেমে সৎ আর অসতের আলাদা কোনো সার্টিফিকেট নেই, কদম! মাঠের কর্মকর্তাদের সামনে সবাই সমানভাবে অরক্ষিত। সিস্টেম যখন স্বচ্ছ হয় না, তখন সৎ ব্যবসায়ীরাও জানে যে—আইনের সঠিক প্রয়োগের চেয়ে কর্মকর্তার মর্জির ওপর তাদের ভাগ্য বেশি নির্ভর করে। কর্মকর্তা মাঠে নামলে দুর্নীতি ও হয়রানির যে বাজার বসে, সেখানে সৎ বা অসত বলে কিছু থাকে না; সবাইকেই ওই বখরা বা দরকষাকষির চক্রে পড়তে হয়। এই helplessness বা অসহায়ত্ব থেকেই জন্ম নেয় বুক চাপড়ানোর ভয়।
বাস্তব কদম আলী: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) তাহলে কি এই ভয় কাটানোর একটাই পথ?
এলিয়েন: একটাই পথ, কদম। হয় আইনগুলোকে এত সহজ ও আধুনিক করো যাতে কোনো ফাঁকফোকর না থাকে, না হয় পুরো কর ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ অটোমেশন বা ডিজিটাল করো। মানুষের মুখাপেক্ষী তদারকি বন্ধ না হলে ব্যবসায়ীদের এই বুক কাঁপুনিও কোনোদিন বন্ধ হবে না।