
চোরাচালান বা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক ও বাজেয়াপ্ত পণ্য এবং নির্ধারিত সময়ে খালাস না নেওয়া আমদানি-রপ্তানি পণ্য নিষ্পত্তিতে নতুন নিয়ম চালু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এখন থেকে এসব পণ্য নিষ্পত্তিতে ই-নিলামকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ই-নিলামে অংশ নিতে প্রত্যেক লটের সংরক্ষিত মূল্যের ৫ শতাংশ ফেরতযোগ্য জামানত দিতে হবে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) এনবিআরের কাস্টমস শাখা থেকে জারি করা স্থায়ী আদেশে এসব বিধান দেওয়া হয়েছে। নতুন আদেশের মাধ্যমে এর আগে জারি করা স্থায়ী আদেশ নং-৯১/কাস্টমস/২০২৫ বাতিল করা হয়েছে।
নতুন আদেশে আটক পণ্য সংরক্ষণ, দাবিদারকে নোটিশ, নিলাম কমিটি গঠন, পণ্যের ইনভেন্টরি, মূল্য নির্ধারণ, বিজ্ঞপ্তি, জামানত, নিলাম, বিক্রয়াদেশ ও পণ্য হস্তান্তর—প্রতিটি ধাপের জন্য আলাদা প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে।
এতে দীর্ঘদিন পড়ে থাকা অখালাসকৃত ও আটক পণ্য দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি নিলাম প্রক্রিয়াকে আরও কাঠামোবদ্ধ ও ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন আদেশ অনুযায়ী, আইন দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমদানি করা পণ্য খালাস বা রপ্তানি সম্পন্ন না হলে নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষকে সংশ্লিষ্ট পণ্যচালানের তালিকা ও দলিল কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে দিতে হবে। একই সঙ্গে এসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে থেকেও তালিকা তৈরি করে নিলাম কার্যক্রম শুরু করা যাবে।
পণ্যচালানের তালিকা প্রস্তুতের পর সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক, রপ্তানিকারক বা তাদের এজেন্টকে পণ্য খালাসের জন্য নোটিশ দিতে হবে। নোটিশের পরও নির্ধারিত সময়ে পণ্য খালাস না করলে ১০০ শতাংশ কায়িক পরীক্ষার পর নিলামে বিক্রির প্রক্রিয়া নেওয়া হবে।
ই-নিলামে ৫ শতাংশ জামানত
জারি করা আদেশে বলা হয়েছে, ই-নিলামে অংশ নিতে প্রত্যেক লটের বিপরীতে সংরক্ষিত মূল্যের ৫ শতাংশ হারে ফেরতযোগ্য জামানত ই-পেমেন্টের মাধ্যমে নির্ধারিত হিসাবে জমা দিতে হবে। ই-নিলাম ছাড়া অন্য নিলামের ক্ষেত্রেও সংরক্ষিত মূল্যের ৫ শতাংশ জামানত দিতে হবে।
ই-নিলামের ক্ষেত্রে সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরদাতাদের তুলনামূলক বিবরণী তৈরি করবে। দরদাতারা সর্বোচ্চ পাঁচজনের দেওয়া সর্বোচ্চ দর দেখতে পারবেন এবং নিলাম চলাকালে একবার দর পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে।
নতুন নিয়মে ই-নিলামে প্রথম নিলামকেই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে তুলনামূলক তালিকা তৈরি করার পর নিলাম কমিটি সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য দরদাতা নির্ধারণ করে কমিশনারের কাছে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করবে।
আদেশ অনুযায়ী, নিলামযোগ্য পণ্যের তালিকা ও লট প্রতি মাসে নিয়মিতভাবে প্রস্তুত করতে হবে। লট তৈরির আগে পণ্যের গুণগত মান, পরিমাণসহ বিভিন্ন বিষয় পরীক্ষা করে ইনভেন্টরি প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে।
আরও পড়ুন
রাজস্বের খরা কাটাতে সরকারের ছয় মাসে যত পদক্ষেপ এনবিআরের
চোরাচালানের অভিযোগে আটক পণ্যের ক্ষেত্রে গুদামে জমা দেওয়ার সময় তৈরি করা গুদাম রেজিস্টারের বর্ণনাকেও ইনভেন্টরি হিসেবে গণ্য করা হবে। ইনভেন্টরির ফলাফলের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট পণ্যের সংরক্ষিত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
নিলামযোগ্য পণ্যের ছবি ও ক্যাটালগ প্রয়োজন অনুযায়ী ই-নিলাম সফটওয়্যারে আপলোড করতে হবে। কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে রাসায়নিক পরীক্ষা বা আমদানি নীতি আদেশের শর্ত পূরণের প্রয়োজন হলে তা ক্যাটালগেও উল্লেখ করতে হবে।
এতে আরও বলা হয়, নিলাম পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী, নিলামের কমপক্ষে সাত কার্যদিবস আগে অন্তত একটি জাতীয় ও একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে। পাশাপাশি এনবিআর ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ওয়েবসাইটেও বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে নিলামের তারিখ, ক্যাটালগ প্রকাশের তারিখ ও মূল্য, পণ্য পরিদর্শনের তারিখ ও সময়সহ প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে। নিলামের অন্তত তিন কার্যদিবস আগে পণ্য পরিদর্শনের সুযোগ রাখতে হবে এবং নিলামের দুই দিন আগে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে হবে।
এছাড়া সংরক্ষিত মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম দেওয়া হয়েছে। আমদানির প্রথম বছর বাদ দিয়ে পরবর্তী বছরগুলোতে বছরভিত্তিক ১০ শতাংশ হারে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সরলরৈখিক অবচয় সুবিধা দিয়ে পণ্যের সংরক্ষিত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে।
তবে পণ্যের গুণগত মান, আমদানির সময়কালসহ অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে কমিশনারের অনুমোদনক্রমে ভিন্ন হারে অবচয় দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, সব পণ্য নিলামে বিক্রি করা হবে না। নতুন আদেশে পণ্যভেদে নিলামের বাইরে বিক্রি, হস্তান্তর বা ধ্বংসের বিধান রাখা হয়েছে। অখালাসকৃত বা চোরাচালানের অভিযোগে আটক ও বাজেয়াপ্ত নির্দিষ্ট পণ্য বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেডের (বিএমটিএফ) কাছে সংরক্ষিত মূল্যের ন্যূনতম ৬০ শতাংশ মূল্যে বিক্রি করা যাবে।
পচনশীল পণ্য টিসিবি নিতে আগ্রহী হলে বোর্ড নির্ধারিত মূল্যে টিসিবির কাছে বিক্রি করতে হবে। মূল্যবান ধাতু ও বৈদেশিক মুদ্রা আইনানুগ প্রক্রিয়া শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
বিস্ফোরক, অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করতে হবে। মদ ও মদ্যজাতীয় পানীয় এবং বিদেশি সিগারেট বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের কাছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করার বিধানও রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন
উৎসে কর আদায় / মাঠে কর্মকর্তা পাঠাবে এনবিআর, ব্যবসায়ীরা বলছেন ‘হয়রানি-দুর্নীতি বাড়বে’
এছাড়া প্রত্নসম্পদ জাতীয় বা আঞ্চলিক জাদুঘর কিংবা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরে হস্তান্তর, প্রাণী বা প্রাণীর দেহাবশেষ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে নিষ্পত্তি এবং ওষুধের কাঁচামাল ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির সুযোগ রাখা হয়েছে।
প্রথম নিলামে ৬০ শতাংশ দর না মিললে দ্বিতীয়বার
ই-নিলাম সম্ভব না হলে প্রচলিত নিলাম পদ্ধতিতে পণ্য বিক্রির বিধান রাখা হয়েছে। প্রথম নিলামে সংরক্ষিত মূল্যের কমপক্ষে ৬০ শতাংশ গ্রহণযোগ্য কোনো দর পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে পণ্য বিক্রির সুপারিশ করতে হবে।
প্রথম নিলামে ৬০ শতাংশের কম গ্রহণযোগ্য দর পাওয়া গেলে পণ্য দ্বিতীয় নিলামে তুলতে হবে। দ্বিতীয় নিলামে আগের নিলামের চেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য দর পাওয়া গেলে সেই মূল্যে বিক্রির সুপারিশ করা যাবে।
প্রথম ও দ্বিতীয় নিলামে বিক্রি না হলে তৃতীয় নিলামে পণ্য তুলতে হবে। তৃতীয় নিলামে যে গ্রহণযোগ্য দর পাওয়া যাবে, সেই মূল্যে বিক্রির সুপারিশ করার বিধান রয়েছে। তিন দফা নিলামেও বিক্রি না হলে পরবর্তী নিলামের জন্য মেগালট তৈরির মাধ্যমে পণ্য তোলার সুপারিশ করা যাবে।
নিলাম অনুমোদনে ৩ কার্যদিবস
নিলাম কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর তিন কার্যদিবসের মধ্যে কমিশনারকে তা অনুমোদন করতে হবে অথবা যুক্তিসঙ্গত কারণ দেখিয়ে আইনানুগ অন্য সিদ্ধান্ত দিতে হবে।
নিলাম অনুমোদনের পর আরও তিন কার্যদিবসের মধ্যে বিজয়ী দরদাতার অনুকূলে বিক্রয়াদেশ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ কারণে এ সময়সীমা আরও দুই কার্যদিবস বাড়াতে পারবেন কমিশনার।
অনুমোদিত লটের তালিকা সংশ্লিষ্ট কাস্টমস হাউস বা কমিশনারেটের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। ই-নিলামের ক্ষেত্রে দরদাতাকে ই-মেইলের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিষয়টি জানানো হবে।
আদেশে বলা হয়, প্রতিবার নিলাম বিজ্ঞপ্তি জারির আগ পর্যন্ত আমদানিকারক বা রপ্তানিকারক তার পণ্য খালাসের আবেদন করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট ন্যায়-নির্ণয়নকারী কর্মকর্তা আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য খালাসের অনুমতি দিতে পারবেন।