দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ডলার সংকটের মধ্যেও এনবিআর ও রাজস্ব আদায়কারী নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। তাদের অভিযোগ, সরকারের নীতিনির্ধারক বা ভ্যাট আদায়ের দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিরা চেয়ারে থাকুন বা না থাকুন, তাদের একমাত্র ফোকাস থাকে কেবল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা (Revenue Target) পূরণের দিকে। কিন্তু ব্যবসার বর্তমান করুণ পরিস্থিতি, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি কিংবা ব্যবসায়িক টিকে থাকার সংগ্রাম তাদের হিসেবে থাকে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভ্যাট কোনো সাধারণ শাস্তিযোগ্য আইন নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক পদ্ধতি। কিন্তু মাঠপর্যায়ের রিয়েল ইকোনমি বা বাস্তব অর্থনীতিকে পাশ কাটিয়ে যখন কেবল লক্ষ্য অর্জনের জন্য কঠোর চাবুক চালানো হয়, তখন তা দীর্ঘমেয়াদে পুরো বাজার ব্যবস্থাকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
ব্যবসায়িক বাস্তবতার চেয়ে লক্ষ্য পূরণই প্রধান:
মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান সময়ে কাঁচামাল আমদানি জটিলতা, অতিরিক্ত ব্যাংক সুদ এবং জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার লড়াই করছে। অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে থেকেও কেবল নিয়মের বেড়াজালে বন্দি। অথচ রাজস্ব বিভাগ থেকে ব্যবসায়ীদের এমনভাবে দেখা হয় যেন সবাই সম্ভাব্য কর ফাঁকিবাজ। ব্যবসা লাভজনকভাবে চলছে কি না, বা উদ্যোক্তার পুঁজি রক্ষা পাচ্ছে কি না—সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের কোনো কার্যকর সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা বা প্রণোদনা থাকে না।
জটিল কমপ্লায়ান্স ও হয়রানি:
বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট ও মাঝারি শিল্পের (SME) উদ্যোক্তাদের জন্য ভ্যাট কমপ্লায়ান্স বা রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া এখনো অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক ও জটিল। ব্যবসার মূল কার্যক্রমে মন দেওয়ার চেয়ে অনেক সময় কেবল কাগজপত্রের পেছনেই উদ্যোক্তাদের মূল্যবান সময় ও শক্তি অপচয় হয়।
অর্থনীতি বাঁচিয়ে রাজস্ব আদায়ের বিকল্প নেই:
বিশ্লেষকদের পরামর্শ, জোর করে সাময়িকভাবে খাতা ভরাট করা হয়তো সম্ভব, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা টিকিয়ে না রাখলে রাজস্বের স্থায়ী উৎস itself বন্ধ হয়ে যাবে। ভ্যাট সফলভাবে আদায় করতে হলে প্রথমে ব্যবসার ক্যাশ ফ্লো (Cash flow) এবং সার্বিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা (Velocity) বাড়াতে হবে।
ব্যবসায়ী সমাজের দাবি, কেবল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে বসে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করে, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাকে আমলে নিয়ে নীতি প্রণয়ন করা হোক। নীতিনির্ধারকরা যদি "ট্যাক্স কালেক্টর"-এর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে "বিজনেস পার্টনার" বা সহায়ক ভূমিকায় অবতীর্ণ না হন, তবে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।