শুধু কর বৃদ্ধি কিংবা তামাক চাষ বন্ধ করে সিগারেটমুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব নয়। ধূমপান কমাতে নতুন ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব মোহাম্মদ শফিকুল আলম।
রাজধানীর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) কার্যালয়ে আয়োজিত "২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে তামাক পণ্যের কার্যকর কর ও মূল্যবৃদ্ধি" শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রেস সচিব বলেন, "তামাকবিরোধী কার্যক্রমে এখন পর্যন্ত কোনো সংস্থাই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি। ধূমপানের হার কমাতে নতুন ধারণা দরকার। কর বাড়িয়ে বা তামাক চাষিদের নিরুৎসাহিত করে ধূমপান বন্ধ করা যাবে না। দেশব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তামাকের ব্যবহার কমানোর দিকে নজর দিতে হবে।"
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশে নারী ধূমপায়ীর সংখ্যা বেড়েছে এবং একটি বড় কোম্পানি নারীদের লক্ষ্য করে নতুন ব্র্যান্ড বাজারে এনেছে। বর্তমানে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের মধ্যেও ধূমপানের হার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।
কর্মশালায় জানানো হয়, গত তিন অর্থবছরে সিগারেটের দাম বেড়েছে মাত্র ৭.৩ শতাংশ, যা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তুলনায় অনেক কম। এর ফলে, প্রতি বছর ৪৭ শতাংশ হারে সিগারেট বিক্রি বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের মাঝামাঝি এসে সব স্তরের সিগারেটের ওপর ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করেছে। তবে, তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম সফল করতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটকে একত্রিত করে প্রতি শলাকার ন্যূনতম মূল্য ৯ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ইআরএফের সভাপতি দৌলত আকতার মালা বলেন, "গত পাঁচ অর্থবছরে কার্যকর করনীতি গ্রহণ করা হলে ১১ থেকে ২৮ শতাংশ পর্যন্ত বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব হতো।"
তিনি আরও বলেন, "সিগারেটের দাম বাড়ানো গেলে সম্পূরক শুল্ক অপরিবর্তিত রেখেও আগামী অর্থবছরে ৪৩ শতাংশ বেশি রাজস্ব আহরণ সম্ভব হবে। তবে গবেষণা অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তামাকজাত দ্রব্য থেকে যে রাজস্ব আয় হয়েছিল, তার চেয়ে বেশি অর্থ খরচ হয়েছিল তামাকজনিত রোগের চিকিৎসায়।"
ডরূপের উপ-নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান জানান, বর্তমানে বাজারে নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও অতি উচ্চ—এই চার স্তরের সিগারেট বিক্রি হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে সিগারেটের মূল্য বৃদ্ধির পরও সবচেয়ে সস্তা সিগারেটের শলাকা ৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
তিনি বলেন, "সিগারেট বিক্রির ৯০ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম স্তরের দখলে। তাই এই দুটি স্তরকে একীভূত করে নতুন তিনটি স্তর নির্ধারণ করা উচিত। এতে দশ-শলাকার একেকটি প্যাকেটের দাম যথাক্রমে ৯০ টাকা, ১৪০ টাকা ও ১৯০ টাকা হওয়া প্রয়োজন।"
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন ডরূপের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী এএইচএম নোমান। তিনি বলেন, "তামাক নিয়ন্ত্রণে কর বৃদ্ধি একটি ব্যয়-সাশ্রয়ী উদ্যোগ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সিগারেট কর সংস্কার বাস্তবায়ন করা হলে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের পাশাপাশি স্বাস্থ্যখাতে অর্থায়ন এবং টেকসই কর ব্যবস্থার উন্নয়ন সম্ভব হবে।"
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (মূসক নীতি) ড. মো. আবদুর রউফ, বিসিআইসির সাবেক চেয়ারম্যান ও লিড পলিসি অ্যাডভাইজার মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ডরূপের নির্বাহী সদস্য এবং তামাকবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
সিগারেটমুক্ত সমাজ গঠনে কর বৃদ্ধি, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও ইনোভেটিভ উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা। গবেষণা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে ধূমপানের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে অভিমত দেন তারা।
মন্তব্য করুন