জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিভাজন ইস্যুতে আন্দোলনের কারণে সাময়িক বরখাস্তের পর লঘুদণ্ড পাওয়া ২০ কর্মকর্তার শাস্তি মওকুফ করেছে সরকার।
গত ২ সেপ্টেম্বর এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব আহসান হাবিব স্বাক্ষরিত পৃথক প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের ওয়েবসাইটে এসব প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছে।
আন্দোলন এখন গলার কাঁটা, ‘গণক্ষমা’ পেতে চান এনবিআর কর্মকর্তারা
শাস্তি মওকুফ পাওয়া কর্মকর্তারা হলেন—উপকমিশনার মো. শাহাদাত জামিল, রাজস্ব কর্মকর্তা শফিউল বাশার, রাজস্ব কর্মকর্তা সবুজ মিয়া, উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইদুল আলম, কমিশনার জাকির হোসেন, যুগ্ম কমিশনার মো. সানোয়ারুল কবির, অতিরিক্ত কমিশনার সাধন কুমার কুন্ডু, অতিরিক্ত কমিশনার আ আ ম আমীমুল ইহসান, অতিরিক্ত কমিশনার সিফাত-ই-মরিয়ম, অতিরিক্ত কমিশনার হাছান মুহাম্মদ তারেক রিকবদার, উপকর কমিশনার নো. জিল্লুর রহমান, উপকর কমিশনার ইমাম তৌহিদ হাসান শাকিল, অতিরিক্ত কর কমিশনার মির্জা আশিক রানা, যুগ্ম কর কমিশনার মোনালিসা শাহরীন সুস্মিতা, যুগ্ম কর কমিশনার মামুন মিয়া, অতিরিক্ত কর কমিশনার মিজ চাঁদ সুলতানা, অতিরিক্ত কর কমিশনার সুলতানা হাবীব, অতিরিক্ত কর কমিশনার মুরাদ আহমেদ, যুগ্ম কর কমিশনার মিজ মাসুমা খাতুন ও যুগ্ম কর কমিশনার মোহাম্মদ মোরশেদ উদ্দীন।
প্রজ্ঞাপনগুলোতে বলা হয়, এসব কর্মকর্তা ২০২৫ সালের ২৪ জুন সকাল সাড়ে ১১টায় রাজস্ব ভবনের প্রবেশপথে অবস্থান করে ওই বছরের ২২ জুন জারি করা বদলির আদেশ আইনসংগত কারণ ছাড়া অবজ্ঞাপূর্বক ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সামনে প্রকাশ্যে ছিঁড়ে ফেলেন। এর মাধ্যমে তারা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন এবং বদলি আদেশ অমান্যকারীকে সমর্থন করেন।
এনবিআরের ৮ কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত
প্রজ্ঞাপনগুলোতে আরও বলা হয়, এ ধরনের আচরণ চাকরির শৃঙ্খলার জন্য হানিকর, শিষ্টাচারবহির্ভূত ও সরকারি আদেশ অবজ্ঞার শামিল। এটি ‘সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর ৩০৩ বিধির লঙ্ঘন এবং ‘সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮’-এর বিধি ৩(খ) অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর পর্যায়ভুক্ত শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বিভাগীয় মামলায় আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারও বেতন কয়েক ধাপ এবং কারও বেতন কয়েক বছরের জন্য অবনমিত করা হয়েছিল।
এতে আরও বলা হয়, এসব কর্মকর্তা দণ্ডাদেশ মার্জনার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে গত ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে রাষ্ট্রপতি বরাবর আপিল আবেদন করেন। রাষ্ট্রপতি আপিল আবেদন মঞ্জুর করে দণ্ডাদেশ বাতিলের আদেশ দেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে কর্মকর্তাদের মূল বেতনে অবনমিতকরণ সূচক লঘুদণ্ড বাতিল করে তাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছে।
এনবিআর কমপ্লিট শাটডাউন অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত
এর আগে গত ১৮ আগস্ট রাজস্ব সম্মেলনে এনবিআর কর্মকর্তারা তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তি তুলে নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আবেদন জানান। ওই সময় প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন।
যেভাবে আন্দোলনের সূত্রপাত
২০২৫ সালে এনবিআরকে দুই ভাগ করে ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা’ ও ‘রাজস্ব নীতি’ নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ করার বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। তবে ওই অধ্যাদেশ বাতিলের দাবিতে কলমবিরতিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে আন্দোলনে নামেন এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
ওই বছরের ২২ মে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অধ্যাদেশে ‘প্রয়োজনীয় সংশোধনী’ আনা হবে। সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান কাঠামোতেই এনবিআরের সব কার্যক্রম চলবে।
এনবিআর চেয়ারম্যান / চলমান আন্দোলনে রাজস্ব আদায়ে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে
এর মধ্যে সংস্থাটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান খানের পদত্যাগের দাবিতে নতুন করে আন্দোলনে নামেন এবং সংস্থার কার্যালয়ে তাকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করেন।
দাবি আদায়ে ২৮ জুন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের আন্দোলনে আমদানি-রপ্তানিসহ এনবিআরের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। পরদিনও কর্মসূচি অব্যাহত থাকলে সংস্থাটির সেবাকে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
পরে ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যস্থতায় আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম ‘এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ’ শাটডাউন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে।
এরপর নতুন সরকার গঠনের আগেই একের পর এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত আসতে থাকে। এর মধ্যে অনেক কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। কারও বিরুদ্ধে নেওয়া হয় লঘুদণ্ড।