Vatbondhu News
প্রকাশ : Apr 23, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

মহাকাশ বনাম মতিঝিল: চতুর্থ পর্ব “ভোক্তার কাঁধে বন্দুক আর রেফারেন্স ভ্যালুর জুলুম"

ঢাকার রাতের আকাশটা আজ অদ্ভুত শান্ত, কিন্তু কদম আলীর মাথার ভেতর চলছে ঘূর্ণিঝড়। ছাদের এক কোণে পায়চারি করতে করতে তিনি বিড়বিড় করছেন। এলিয়েন ভাই তো ঠিকই বলেছে, পেমেন্ট বেজড না হলে সব ডাটাই তো সাজানো। কিন্তু সরকার পেমেন্ট ডাটা ধরছে না কেন? আর ব্যবসায়ীরাই বা কেন এই অন্যায় মেনে নিচ্ছে? সব কি তবে সাধারণ ভোক্তার পকেট থেকেই যাচ্ছে?”
হঠাৎ বাতাসের কম্পন তীব্র হলো। নীলচে এক আলোর ঝিলিক দিয়ে ছাদের ওপর ল্যান্ড করল সেই চিরচেনা রুপালি চাকতি। লেজার মই বেয়ে গম্ভীর মুখে নেমে এলেন এলিয়েন কদম আলী, তার মাথার চারটি অ্যান্টেনা আজ তীব্র বেগুনি হয়ে জ্বলছে, যা তার গভীর চিন্তার লক্ষণ।
মহাকাশ বনাম মতিঝিল: চতুর্থ পর্ব
“ভোক্তার কাঁধে বন্দুক আর রেফারেন্স ভ্যালুর জুলুম"

কদম আলী:(একটু উত্তেজিত হয়ে) এলিয়েন ভাই! তুই একদম ঠিক সময়ে আসছিস। তোর কালকের কথাগুলো আমাকে ঘুমাতে দেয়নি। একটা বড় প্রশ্ন আমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে— এই যে কাস্টমস পেমেন্ট ডাটা না ধরে জোর করে 'রেফারেন্স ভ্যালু' বা বেশি দাম ধরে ট্যাক্স নিচ্ছে, এটা কি ব্যবসায়ীরা বুঝছে না? তারা কেন বিদ্রোহ করছে না? তারা কেন এই অন্যায় মেনে নিয়ে ব্যবসা করে যাচ্ছে?
এলিয়েন কদম:(একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, যা থেকে হালকা ধোঁয়া বের হলো) কদম রে, তোদের এই মানবজাতির মনস্তত্ত্ব বোঝা বড় কঠিন! তোরা যাকে 'ব্যবসা' বলিস, আমাদের গ্যালাক্সিতে তাকে বলা হয় 'সারভাইভাল অফ দ্য চতুর'। শোন, ব্যবসায়ীরা কেন মানছে, তার কারণটা খুব সহজ কিন্তু নিষ্ঠুর। ব্যবসায়ী যখন দেখে যে সে ৮০ টাকার মাল ১০০ টাকা অ্যাসেসমেন্ট করিয়ে বাড়তি ট্যাক্স দিচ্ছে, সে তখন প্রতিবাদ করে সময় নষ্ট করে না। সে শুধু তার ক্যালকুলেটরের বোতামটা টিপে ওই বাড়তি ট্যাক্সের টাকাটা পণ্যের 'কস্টিং'-এ ঢুকিয়ে দেয়। 

কদম আলী:(থমকে গিয়ে) তার মানে... ওই বাড়তি ২০ টাকার ওপর যে বাড়তি ট্যাক্স সরকার নিল, সেটা ব্যবসায়ী নিজের পকেট থেকে দেয় না?
এলিয়েন কদম:*(হলোগ্রাফিক ট্যাবলেটে একটা ফ্লোচার্ট দেখাল) আরে না! বোকা হস না কদম। ব্যবসায়ী তো কোনো চ্যারিটি করতে বসেনি। সে দেখেছে— "সরকার আমার কাছ থেকে ৫ টাকা বেশি নিয়েছে, তাই আমি পণ্যের দাম ১০ টাকা বাড়িয়ে দেব।" এই যে বাড়তি করের বোঝা, এটা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে কার ওপর? ওই যে নিচে তোর মতো যারা বাজার করতে যায়, সেই ভোক্তারওপর। ব্যবসায়ী এখানে কেবল একটা 'ট্যাক্স কালেক্টর' বা উসুলকারীর কাজ করছে। সে সরকারের জুলুম মাথা পেতে নেয়, কারণ সে জানে এটা সে জনগণের কাছ থেকে উসুল করে নিতে পারবে।

কদম আলী: ওরে সর্বনাশ! তার মানে লড়াইটা সরকারের সাথে ব্যবসায়ীর না, লড়াইটা আসলে পরোক্ষভাবে সরকারের সাথে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পকেট নিয়ে?

এলিয়েন কদম: একদম ঠিক ধরেছিস! তোদের এই ব্যবস্থাকে তোরা বলিস 'ইনডাইরেক্ট ট্যাক্স', কিন্তু আমি একে বলি অদৃশ্য পকেটমারি"। ব্যবসায়ী এখানে নিরাপদ, সরকারও খুশি কারণ তাদের কোষাগার ভরছে। মাঝখান থেকে নিষ্পেষিত হচ্ছে সাধারণ ভোক্তা। আর এই পুরো খেলাটা খেলার জন্য তোদের কাস্টমস ব্যবহার করে সেই কুখ্যাত 'রেফারেন্স ভ্যালু'।
কদম আলী:কিন্তু এলিয়েন ভাই, পেমেন্ট বেজড অ্যাসেসমেন্ট করার উপায় কি আসলেই খুব কঠিন? তোদের গ্রহে এটা কীভাবে কাজ করে?

এলিয়েন কদম:(অ্যান্টেনাগুলো ঘুরিয়ে) মোটেও কঠিন না কদম! এটা স্রেফ এক সেকেন্ডের ব্যাপার। তোদের দেশেও এটা সম্ভব যদি তোরা System Trust" এ বিশ্বাস করতি। উপায়টা শোন:
১. যখনই কোনো আমদানিকারক ব্যাংক দিয়ে টাকা (LC/TT) পাঠাবে, সেই পেমেন্টের ডাটা সরাসরি কাস্টমসের সার্ভারে হিট করবে।
২. কাস্টমস অফিসার ওই ডাটা বদলানোর কোনো ক্ষমতা রাখবে না। সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেখবে ব্যাংক কত টাকা পাঠিয়েছে।
৩. ঠিক সেই টাকার ওপরই শুল্ক ধার্য হবে। কোনো 'রেফারেন্স ভ্যালু' বা 'অ্যাসাসমেন্ট'-এর নাটক থাকবে না।
একে আমরা বলি ডিজিটাল পেমেন্ট ইন্টিগ্রিটি। 
**কদম আলী:কিন্তু এলিয়েন ভাই, আমাদের এখানে তো বলবে— "ব্যবসায়ীরা তো আন্ডার-ইনভয়েসিং করে কম টাকা পাঠিয়ে কর ফাঁকি দিতে পারে!"

এলিয়েন কদম:** (হেসে) ওরে কদম! তোরা এখনো সেই মান্ধাতা আমলের অজুহাতে পড়ে আছিস? যদি কোনো ব্যবসায়ী আন্ডার-ইনভয়েসিং করে, তবে সে টাকা পাঠাবে কীভাবে? সে কি মহাকাশ থেকে টাকা পাঠাবে? সব তো ব্যাংকিং চ্যানেলেই হবে। আর এখন গ্লোবাল ডাটাবেজ আছে। সিস্টেম নিজেই চেক করতে পারে যে পৃথিবীতে ওই পণ্যের দাম কত। কিন্তু তোদের এনবিআর কেন এটা করে না জানিস? কারণ ওই যে বললাম— স্বচ্ছতা আসলে 'ব্যক্তিগত ক্ষমতার' মৃত্যু ঘটে। অফিসার তখন আর বলতে পারবে না, "আমার কাছে রেফারেন্স ভ্যালু বেশি আছে, কিছু চা-পানি খাওয়াইলে কমিয়ে দেব।"

কদম আলী: তার মানে, রেফারেন্স ভ্যালু হলো দুর্নীতির একটা অফিশিয়াল গেটওয়ে?
এলিয়েন কদম: শুধু অফিশিয়াল গেটওয়ে না, এটা হলো তোদের অর্থনীতির ক্যান্সারের উৎপত্তিস্থল। দেখ কদম, যখনই সরকার পেমেন্ট ডাটা বাদ দিয়ে কাল্পনিক দামে ট্যাক্স নেয়, তখনই বাজারে পণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে বেড়ে যায়। ব্যবসায়ী তার খরচ মেটাতে গিয়ে মুনাফা বাড়িয়ে দেয়। আর ভোক্তারা সেই Triple Hit"এর প্রভাবে পিষ্ট হয়। তোরা যেটাকে মুদ্রাস্ফীতি বলিস, তার একটা বড় অংশই হলো তোদের এই ত্রুটিপূর্ণ কর ব্যবস্থার দান।

কদম আলী:কিন্তু এলিয়েন কদম, ব্যবসায়ীরা তো অন্তত এই আস্থার অভাবে প্রতিবাদ করতে পারতো! তারা কেন সবাই মিলে এক হচ্ছে না?
এলিয়েন কদম: কারণ তোদের দেশে 'সিস্টেম ট্রাস্ট' নেই, আছে 'পাওয়ার ট্রাস্ট'। ব্যবসায়ীরা ভয় পায়, যদি তারা প্রতিবাদ করে তবে তাদের অডিট হবে, তাদের ফাইল আটকে যাবে, কিংবা তাদের ওই *রিস্ক মডিউলে* লাল বাতি জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। এই ভয়ের কালচারটাই তোদের ব্যবস্থার প্রাণ। সবাই চায় কোনোমতে টিকে থাকতে, আর টিকে থাকার সবচেয়ে সহজ পথ হলো— সরকারের অন্যায় মেনে নেওয়া এবং তার খেসারত ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া।

*কদম আলী:* (মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ল) বন্ধু, আমি তো ভেবেছিলাম সমস্যাটা কেবল এনবিআরের। এখন দেখছি এটা একটা চক্র। সরকার বেশি নেয়, ব্যবসায়ী সেটা ভোক্তার পকেট থেকে কেটে নেয়, আর আমরা সাধারণ মানুষ আকাশ পানে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলি।
এলিয়েন কদম:*(কদম আলীর কাঁধে তার সবুজ রঙের হাতটা রাখল) কদম, তোদের এই পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে ডিজিটাল ট্রাস্ট'ছাড়া উপায় নেই। পেমেন্ট বেজড অ্যাসেসমেন্ট হলো সেই প্রথম ধাপ। যেদিন তোদের এলসি ডাটা আর কাস্টমস অ্যাসেসমেন্ট এক হয়ে যাবে, সেদিন তোদের কোনো রেফারেন্স ভ্যালু লাগবে না, কোনো রিস্ক মডিউলের ভয়ও থাকবে না। ডাটা যখন সত্য বলবে, তখন মিথ্যাওয়ালারা আপনাআপনি পালাবে।

কদম আলী: তোদের ওখানে কি কোনোদিন এমন দুর্নীতি হয়েছিল?
এলিয়েন কদম: হাজার বছর আগে আমাদের এক গ্রহে হয়েছিল। তখন আমরা সব ফাইল পুড়িয়ে ফেলে পুরো সিস্টেমকে 'ব্লকচেইন' আর 'রিয়েল-টাইম পেমেন্ট'-এ নিয়ে আসলাম। এখন সেখানে কর দেওয়া মানে হলো সমাজের জন্য অবদান রাখা, কারো পকেট ভারি করা নয়।

**কদম আলী:(আশাবাদী হয়ে) আমাদের এখানেও কি এমন দিন আসবে এলিয়েন ভাই?
এলিয়েন কদম:(ইউএফও-র দিকে ফিরে যেতে যেতে) আসবে কদম, যেদিন তোরা ব্যক্তির ওপর ভরসা না করে অ্যালগরিদম আর স্বচ্ছ ডাটার ওপর ভরসা করবি। আর শোন, কালকের বাজারে যখন তেলের বোতল কিনবি, তখন মনে রাখিস— ওর গায়ে যে দামটা লেখা আছে, তার একটা বড় অংশই হলো তোদের ওই ত্রুটিপূর্ণ 'অ্যাসাসমেন্ট'-এর খেসারত!

ইউএফও-টি বিকট এক আলোর ঝলক দিয়ে মেঘের ওপারে মিলিয়ে গেল। কদম আলী ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে নিচে অন্ধকার শহরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। রাজপথের আলোগুলোকে আজ তার রেফারেন্স ভ্যালুর মতো মরীচিকা মনে হচ্ছে। তিনি বিড়বিড় করে বললেন, ব্যবসায়ী বাঁচে মুনাফায়, সরকার বাঁচে রাজস্বে, আর কদম আলী মরে মুদ্রাস্ফীতির চাপে। সত্যিই এলিয়েন ভাই, সিস্টেম ট্রাস্ট ছাড়া সব কল্পনা!


মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ট্রাম্প ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন, প্রথম দিনেই সই করবেন রেকর্ডসংখ্য

1

বিশ্বকাপ নিয়ে রিভালদোর সঙ্গে তর্কে জড়ালেন নেইমার

2

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ও অপারেশনাল ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করতে আগ্রহ

3

আশাব্যঞ্জক অগ্রগতির ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে : আলী রীয়াজ

4

কোম্পানি করদাতাদের জন্য কর জমার সময়সীমা বাড়ালো এনবিআর

5

পারিবারিক সঞ্চয়পত্র আর যৌথ নামে কেনা যাবে না

6

করোনাকালে বাড়লেও ক্রমেই কমছে স্টার্টআপে বিনিয়োগ, নীতি সহজ কর

7

আলহাজ টেক্সটাইলসের সর্বোচ্চ দরপতন

8

ভ্যাট ব্যবস্থায় বাস্তব অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনের সমন্বয় জরুরি : ম

9

আমি চুয়েটের শিক্ষার্থী, তাই আবেগ ও দায়বদ্ধতাও বেশি : চুয়েটের

10

কর দিয়ে কেউ দেউলিয়া হয় না : এনবিআর চেয়ারম্যান

11

নতুন বছরের শুরুতেই যেসব ফোনে বন্ধ হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ

12

করোনাকালে বাড়লেও ক্রমেই কমছে স্টার্টআপে বিনিয়োগ, নীতি সহজ কর

13

আরও ৯টি শুল্ক স্টেশন দিয়ে আলু আমদানির অনুমতি

14

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি: তদন্তভার সিআইডি থেকে নিতে চা

15

শরীয়তপুর সাংবাদিক সমিতির সভাপতি পলাশ, সম্পাদক মামুন

16

দ্বিতীয় দিনের বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আলোচনা শেষ

17

ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করতে গিয়ে জানলেন তিনি ‘মৃত’

18

টেসলা কিনলেও রাস্তায় চালাতে পারবেন না ট্রাম্প

19

ফেব্রুয়ারি থেকে আমদানি-রপ্তানির সব সনদ অনলাইনে জমা বাধ্যতামূ

20