অতিরিক্ত আদর্শবাদ যখন আত্মঘাতী হয়ে ওঠে?
লেখক: মো. আলিমুজ্জামান
বাংলাদেশের কর প্রশাসনে ভ্যাট আইন (মূল্য সংযোজন কর আইন) একসময় আশা জাগানো একটি সংস্কার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ভ্যাট ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আধুনিকীকরণ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতার পর্দা উঠতেই দেখা গেল, এই আইন তার “অতিরিক্ত ভালো” হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় এমন এক জটিল রূপ নিয়েছে, যা অনেক সময় নিজেই নিজের পরিচয় হারিয়ে ব্রেকহীন গাড়ীর মত আচরন করছে।
একইভাবে, সমাজজীবনে ‘পরকীয়া প্রেম’ও প্রায়শই শুরু হয় ভালোবাসার পবিত্রতা ও নিঃস্বার্থতার নামে— অথচ শেষ পর্যন্ত তা ধ্বংস, বেদনা ও ক্ষতির প্রতীক হয়ে ওঠে। যার ফলাফল হয় একজন কবরে আর অন্যজন জেলে অবস্থান করে, ভূক্তভোগী পক্ষ হয় সন্তানেরা। এ দুই ভিন্ন ক্ষেত্রের এক আশ্চর্য মিল আছে: উভয়ই অতিরিক্ত আদর্শবাদে বিশ্বাসী, এবং উভয়েরই পরিণতি প্রায়শই আত্মঘাতী, আর মজার বিষয় হল উভয় ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রন্ত পক্ষ ভিন্ন থাকে।
ভ্যাট আইনের অতিরিক্ত “ভালো” হওয়া ২০১২ সালের ভ্যাট আইনটি প্রণীত হয়েছিল উন্নত দেশের মানদণ্ড অনুযায়ী। উদ্দেশ্য ছিল একটি একক, স্বচ্ছ ও ইনভয়েসভিত্তিক করব্যবস্থা গড়ে তোলা। যেখানে প্রতিটি লেনদেনের ওপর নজর থাকবে, কেউ ফাঁকি দিতে পারবে না।কাগজে-কলমে এটি নিখুঁত এক আইন যেমন কোনো নিখুঁত প্রেমের প্রতিশ্রুতি।
২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত নিগুর বোঝাপরার সূযোগ তৈরী করে দিলেও, সমস্যা শুরু হয় বাস্তবায়নের জায়গায়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, ব্যবসায়িক সংস্কৃতি এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতি কোনো কিছুই তখন এই আইন বাস্তবায়নের উপযুক্ত ছিল না। হাজারো ব্যবসায়ী অটোমেশন বোঝে না, ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো ইলেকট্রনিক ইনভয়েসিং সিস্টেমে অভ্যস্ত নয়, আবার অনেক কর কর্মকর্তা নিজেরাই নতুন আইনের প্রযুক্তিগত বিষয়গুলো পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারেননি।
ফলাফল, আইনটি বাস্তবে কার্যকর হওয়ার পরিবর্তে হয়ে ওঠে জটিলতার প্রতীক।একটি আইন যখন এতটাই নিখুঁত হতে চায় যে, বাস্তবতার সঙ্গে আপস করতে রাজি নয়, তখন সেটি নিজের লক্ষ্য থেকেই বিচ্যুত হয়ে যায়।বর্তমানে নিজের লক্ষ্য থেকে এতটা বিচ্চুত হয়েছে যে, সুস্থ ও স্বাভাবিক সম্পর্ক জোড়াতালি দিয়ে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ফিরতে হয়েছে সেই পুরাতনের কাছে। ঠিক যেমন পরকীয়ার অতিরিক্ত ভালোবাসার সম্পর্ক, যা বাস্তবতার মুখে টেকে না।
পরকীয়া প্রেমের শুরুটা প্রায়ই হয় “বিশুদ্ধ ভালোবাসা”-র তীব্র বিশ্বাস নিয়ে। এখানে মানুষ ভাবে— “আমি ভালোবাসি, তাই আমি ভুল করছি না।” কিন্তু সমাজ, পরিবার, নৈতিকতা ও বাস্তব জীবনের কাঠামো এই সম্পর্কের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
একটি নিষিদ্ধ ভালোবাসা যত গভীর হয়, ততই বাড়ে নিজের ও অন্যের ক্ষতির সম্ভাবনা।এখানেও একই যুক্তি কাজ করে— অতিরিক্ত ভালোবাসা বা অতিরিক্ত আদর্শবাদ শেষ পর্যন্ত বাস্তবতার দেয়ালে আঘাত খায়।যেমন ভ্যাট আইন নিখুঁত স্বচ্ছতা চেয়ে কার্যকারিতা হারিয়েছে, তেমনি পরকীয়া প্রেম নিখুঁত ভালোবাসার খোঁজে স্থিতিশীলতা হারায়।
দুটি ঘটনাতেই মূল সমস্যা একটাই, বাস্তবতার সঙ্গে সংযোগহীনতা এবং বর্তমানে সামাজিক ও ব্যবসায়িক সমস্যার মূল কারণ। ভ্যাট আইন চেয়েছিল এমন এক নির্ভুল ব্যবস্থা, যেখানে কেউ ভুল করবে না। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা হলো, ব্যবসা চলে মানবিক ত্রুটি, সমঝোতা ও প্রক্রিয়াগত নমনীয়তার ওপর। পরকীয়া প্রেম চায় এমন ভালোবাসা, যেখানে সমাজের কোনো বাধা থাকবে না। অথচ সমাজ নামক বাস্তব কাঠামোতেই মানুষ বেঁচে থাকে। অতিরিক্ত ভালো হওয়ার এই প্রবণতাই শেষ পর্যন্ত নিজের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ভ্যাট আইনে তা রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যবসায়িক বিভ্রান্তি আনে; পরকীয়ায় তা আনে সম্পর্কের ভাঙন, মানসিক অস্থিরতা ও সামাজিক অপবাদ।
“এত ভালো হয় গো কেউ নিজের ক্ষতি করে” এই কথাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর সামাজিক ও প্রশাসনিক শিক্ষা।একজন আইনপ্রণেতা, প্রেমিক বা প্রশাসক— কেউই যদি বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা না বোঝে, তবে তার ‘ভালো উদ্দেশ্য’ও শেষ পর্যন্ত ক্ষতির কারণ হয়।ভ্যাট আইন ও পরকীয়া প্রেম— দুটি ভিন্ন জগৎ, কিন্তু তাদের পরিণতি একই বার্তা দেয়: বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে ভালো হতে চাওয়া মানে নিজের ক্ষতি ডেকে আনা। অতএব, রাষ্ট্রের করব্যবস্থা হোক বা মানুষের সম্পর্ক— “অতিরিক্ত ভালো” নয়, বরং “সমন্বিতভাবে সঠিক” হওয়াই টেকসই উন্নয়নের আসল পথ।