ঢাকার সেই একই ছাদের কার্নিশে পা ঝুলিয়ে বসে আছে কদম আলী। হাতে সস্তা একটা প্লাস্টিকের চায়ের কাপ। আজ চাঁদটা একটু বেশিই লালচে, যেন আকাশের গায়েও কেউ ভ্যাট বসিয়েছে। হঠাৎ বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাপিয়ে একটা রুপালি রঙের চাকতি (UFO) নিঃশব্দে নিচে নামল। লেজার বিম দিয়ে তৈরি একটা মই বেয়ে নেমে এলো সেই পরিচিত সবুজ রঙের স্যুট পরা এলিয়েন কদম আলী।
তার মাথায় চারটা অ্যান্টেনা আজ সিগন্যালের অভাবে লাল হয়ে জ্বলছে-নিভছে।
মহাকাশ বনাম মতিঝিল: দ্বিতীয় পর্ব
ভিত্তিহীন রিস্ক আর গাণিতিক মরীচিকা
কদম আলী:(চায়ের কাপটা পাশে রেখে) কিরে এলিয়েন ভাই! গ্যালাক্সি-৯ থেকে আবার আসলি? ওখানে কি এলিয়েন ভ্যাট অফিসাররা তোকে ধাওয়া করছে নাকি?
এলিয়েন কদম:(মাথার এন্টেনাগুলো একটা ঝাড়া দিয়ে) আর বলিস না কদম! আমি আকাশ থেকে তোদের এনবিআর-এর নতুন সিগন্যাল ট্র্যাক করতে গিয়ে আমার ইউএফও-র জিপিএস বিগড়ে গেছিল। তোরা নাকি এখন রিস্ক মডিউল'(Risk Module) নামের এক অদ্ভুত মহাজাগতিক রশ্মি ছেড়েছিস? আমি তো ভেবেছিলাম এটা দিয়ে বোধহয় তোরা অন্য গ্রহে যাওয়ার পোর্টাল খুলবি!
কদম আলী:(হেসে) পোর্টাল না রে ভাই, ওটা হলো আমাদের ব্যবসায়ীদের 'নরক' দেখানোর নতুন ডিজিটাল জানালা। তুই তো মহাকাশ থেকে সব দেখিস, বল তো—ওটা কি আসলেই চোর ধরে, না কি আমাদের মতো কদম আলীদের ধরে পকেট খালি করে?
এলিয়েন কদম:(তার পকেট থেকে একটা স্বচ্ছ হলোগ্রাফিক ট্যাবলেট বের করল) শোন কদম, আমি তোদের সিস্টেমটা ডিকোড করলাম। তোদের এই 'রিস্ক মডিউল' দেখে আমার মঙ্গলে থাকা ল্যাবরেটরির রোবটগুলোও হাসছে। তোদের এখানে তো দেখি— ঘোড়া নেই, কিন্তু চাবুক রেডি!
কদম আলী:মানে কী? একটু বুঝিয়ে বল তো! ঘোড়া চাবুক এগুলো তোর মাথায় আসলো কেন?
এলিয়েন কদম:আমাদের গ্যালাক্সিতে নিয়ম হলো, কোনো গ্রহে কর বসানোর আগে আমরা একটা কম্বাইন্ড Integrated System বানাই। সেখানে কাস্টমস পোর্ট, ইন্টারগ্যালাক্টিক ব্যাংক আর সেন্ট্রাল সার্ভার—সবগুলো একটা আরেকটার সাথে কথা বলে। একটা ডাটা কোথাও ইনপুট দিলে বাকি সব জায়গায় তা আলোর গতিতে আপডেট হয়ে যায়। একে তোরা বলিস 'অটোমেশন', আমরা বলি 'সিস্টেম ট্রাস্ট'। ঘোড়া চাবুক জানতে পড়ালেখা করতে হয়, তোরা তো সেটাও করতে চাস না। দোষ দিস এনবিআর এর।
কদম আলী: আমাদের এখানেও তো ওই একই নাম। কিন্তু বাস্তবে সব আলাদা।
এলিয়েন কদম: সেটাই তো ট্র্যাজেডি! আমি স্ক্যান করে দেখলাম, তোদের কাস্টমস সার্ভার (Asycuda) আর ভ্যাট সার্ভার (iVAS) একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু কেউ কারো ভাষা বোঝে না। তোদের ব্যাংকগুলো তো দেখি এখনো ম্যানুয়াল ডাটা এন্ট্রির যুগে পড়ে আছে। অথচ তোদের হর্তাকর্তারা এই ভাঙাচোরা ব্যবস্থার ওপর বসাতে চাইছে 'রিস্ক মডিউল'। এটা তো অনেকটা আমার স্পেস এর ইঞ্জিন ছাড়া কেবল এসি চালু করার মতো!
কদম আলী: একদম ঠিক কথা বলছিস। আমি কাল কদম (১)-এর কাছে শুনলাম, এটাকে বলে Put the cart before the horse। কিন্তু এলিয়েন ভাই, সিস্টেম কম্বাইন্ড না হলে রিস্ক মডিউল কি কাজই করবে না?
এলিয়েন কদম:(ট্যাবলেটে একটা ম্যাপ দেখাল) কাজ করবে, তবে সেটা হবে 'বিপজ্জনক'। শোন কদম, রিস্ক মডিউল হলো একটা 'প্রেডিক্টিভ অ্যালগরিদম'। সে তথ্যের নির্ভুলতা বিচার করে। এখন যদি তোর ইনপুট ডাটাই ভুল হয় (Garbage In), তবে মডিউল তোকে 'রিস্কি' হিসেবে লাল সংকেত দেবে (Garbage Out)।
ধর, তুই বিদেশ থেকে ১০ টন আটা আনলি। কাস্টমস ডাটাবেজে ওটা আছে। কিন্তু ভ্যাট রিটার্নে তুই ভুল করে ৯ টন লিখলি। সিস্টেম যদি কম্বাইন্ড হতো, তবে ওটা অটোমেটিক মিলে যেত। কিন্তু এখন সিস্টেম আলাদা বলে রিস্ক মডিউল মনে করবে তুই ১ টন আটা চুরি করেছিস! সাথে সাথে তোর ব্যবসা লাল বাতি!
কদম আলী:ওরে বাবা! তার মানে কারিগরি ভুলকে তারা কর ফাঁকি হিসেবে ধরবে?
এলিয়েন কদম: অবশ্যই! আর এটাই হলো এই পরিকল্পনার অন্ধকার দিক। তোদের নীতি-নির্ধারকরা ব্যবসায়ীদের 'সিস্টেম' শেখানোর বদলে তাদের 'রিস্ক' দেখাচ্ছে। এটা তো মরীচিকার মতো। ব্যবসায়ীরা যখন দেখবে সিস্টেম তাদের অহেতুক হয়রানি করছে, তখন তারা ভ্যাটের জালেই ঢুকতে চাইবে না। এতে তোদের ওই Triple Hit এর প্রভাবে অর্থনীতি আরও নিচের দিকে নামবে।
কদম আলী: কিন্তু এলিয়েন কদম, ওরা কি আসলেই এত বোকা? না কি এর পেছনে অন্য কোনো মহাজাগতিক রহস্য আছে?
এলিয়েন কদম: (অ্যান্টেনাগুলো রহস্যময়ভাবে কাঁপিয়ে) বোকা কেউ না রে কদম। আমি যখন তোদের এনবিআর বিল্ডিঙের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিলাম, তখন দেখলাম মানুষের মনে 'ক্ষমতা'র লোভ অনেক বেশি। সিস্টেম যদি সত্যিই 'কম্বাইন্ড' বা ইন্টিগ্রেটেড হয়ে যায়, তবে তো অফিসারদের আর ফাইল আটকানোর ক্ষমতা থাকবে না। কোনো ঘুষের লেনদেন হবে না। কারণ ডাটা তখন হবে 'সুপার পাওয়ার'। তাই তারা এমন একটা সিস্টেম পছন্দ করে যা দেখতে ডিজিটাল, কিন্তু ভেতরটা ম্যানুয়াল। যাতে দরকার পড়লে যে কাউকে 'রিস্কি' সাজিয়ে চাপ দেওয়া যায়।
কদম আলী: তুই তো দেখি আমাদের দেশের মানুষের মনও পড়তে পারিস! আচ্ছা ভাই, তোর গ্যালাক্সিতে কি ব্যবসায়ীদের সম্মান আছে?
এলিয়েন কদম: আমাদের ওখানে ব্যবসায়ীদের বলা হয় Galaxy Fuel। কারণ তারা কর দেয় বলেই আমাদের নক্ষত্রগুলো জ্বলে। তাই আমাদের সিস্টেম তাদের সেবা করে, ভয় দেখায় না। তোদের এখানে তো দেখি করদাতা মানেই একটা 'টার্গেট'। তোদের সিস্টেম ট্রাস্ট একদম জিরো। আলিমুজ্জামান সাহেবের সেই কথাটা মনে আছে তো? — পড়ি উড়ে যায় থাকে কল্পনা। তোদের এই রিস্ক মডিউলও এখন একটা কল্পনা, কারণ এর কোনো বাস্তব ভিত্তি বা কম্বাইন্ড ডাটাবেজ নেই।
কদম আলী:(দীর্ঘশ্বাস ফেলে) তোদের ওই গ্রহটা খুব সুন্দর হবে রে! আমাদের এখানে তো পরিকল্পনা মানেই হলো পকেট কাটার নতুন ছুরি। এই যে তুই দেখছিস নিচে জ্যাম, মানুষের হাহাকার—এসবই তো হলো অব্যবস্থাপনার ফল।
এলিয়েন কদম:শোন কদম, আমি যাওয়ার আগে তোকে একটা টিপস দিয়ে যাই। তোদের এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে তোকে শুধু কর দিলে হবে না, তোকে 'সিস্টেম আর্কিটেকচার' বুঝতে হবে। ব্যবসায়ীদের দাবি করতে হবে— আগে ইন্টিগ্রেশন, পরে রিস্ক অ্যানালাইসিস"। মাটির নিচে শক্ত ভিত না থাকলে চারতলায় রিস্ক মডিউলের এসি বসিয়ে লাভ নেই, পুরো দালানই ধসে পড়বে।
কদম আলী:তোর কথাগুলো যদি আমাদের চেয়ারম্যান সাহেবের কানে পৌঁছাত!
এলিয়েন কদম:(ইউএফও-তে ওঠার সময়) পৌঁছেছে কি না জানি না, তবে মহাকাশে তোদের এই অগোছালো ডাটার নয়েজ শোনা যায়। যেদিন তোদের সিস্টেমগুলো একে অপরের সাথে হ্যান্ডশেক করবে, সেদিন আমি আবার আসবো। সেদিন তোকে একটা ডাবল চার্জ কফি খাওয়াবো যা ভ্যাট-ফ্রি!
কদম আলী: যাস না ভাই! যাওয়ার আগে বলে যা— আমাদের এই কদম আলীদের দিন কি আদৌ ফিরবে?
এলিয়েন কদম:( চাকতিটা ওড়ার সময় নিচের দিকে লেজার আলো দিয়ে লিখে গেল) — Only System Trust Can Fix The Galaxy!(কেবল সিস্টেম ট্রাস্টই পারে এই গ্যালাক্সি ঠিক করতে!)
ইউএফও-টি আলোর গতিতে মিলিয়ে গেল। কদম আলী ছাদের কোণে একা বসে রইল। তার চায়ের কাপের ভেতরে একটা ছোট সবুজ লেজার আলো এখনো নাচছে। সে বুঝতে পারল, এলিয়েন কদম একটা বড় সত্যি বলে গেছে— সিস্টেম যদি স্বচ্ছ না হয়, তবে ডিজিটাল হওয়া মানেই হলো হয়রানির নতুন নাম।
কদম আলী আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করল— ঘোড়া ছাড়া গাড়ি চালানোর শখ আমাদের যাবে না, তাই না এলিয়েন ভাই?---