মতামত | ভ্যাটবন্ধু নিউজ ডেস্ক
এনবিআর করদাতার সংখ্যা ৪ কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বিভিন্ন নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলক করে করের জাল বিস্তার করা হচ্ছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বলছে, কেবল বাধ্যবাধকতা দিয়ে বা প্রযুক্তির প্রলেপ দিয়ে রাজস্ব আদায় বাড়ানো সম্ভব নয়। এর জন্য সবার আগে প্রয়োজন এনবিআর-এর দীর্ঘদিনের লালিত 'জমিদারী মনোভাব' পরিহার করা।
করদাতা কি প্রজা, নাকি অংশীদার?
বর্তমান ব্যবস্থায় একজন সাধারণ করদাতা যখন ট্যাক্স অফিসে যান বা এনবিআর-এর কোনো নোটিশ পান, তখন তিনি নিজেকে রাষ্ট্রের একজন সম্মানিত নাগরিকের বদলে একজন 'অপরাধী' বা 'প্রজা' হিসেবে অনুভব করেন। কর কর্মকর্তাদের আচরণে অনেক সময় সেবার বদলে 'শাসন' করার মানসিকতা ফুটে ওঠে। এই জমিদারী সংস্কৃতিই সাধারণ মানুষকে কর ব্যবস্থা থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। উন্নত বিশ্বে কর বিভাগ করদাতার "সার্ভিস প্রোভাইডার" হিসেবে কাজ করে, কিন্তু আমাদের দেশে তারা এখনো অনেক ক্ষেত্রে "অধিপতি" হিসেবে আবির্ভূত হয়।
হয়রানি বনাম অটোমেশন
সরকার ডিজিটালাইজেশনের কথা বলছে, কিন্তু পর্দার আড়ালে ফাইল এখনো কর্মকর্তাদের মর্জির ওপর নির্ভর করে। এই "পারসন-ডিপেন্ডেন্ট" সিস্টেমই দুর্নীতির মূল উৎস। একজন করদাতা যদি মনে করেন যে সঠিক কর দেওয়ার পরেও তাকে কর্মকর্তাদের টেবিলে টেবিলে ঘুরতে হবে বা অহেতুক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে, তবে তিনি কেন সিস্টেমে ঢুকবেন? করদাতাদের মনে এই ভয় প্রোথিত হয়ে গেছে যে—"একবার জালে ঢুকলে আর রক্ষা নেই।" এই ভয় দূর করতে না পারলে ৪ কোটি টিআইএন কেবল কাগজের সংখ্যাই বাড়াবে, রিটার্ন দাখিল বাড়বে না।
ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতির ঝুঁকি
এনবিআর যখন ব্যাংক লেনদেনের ওপর অতিরিক্ত নজরদারি এবং কড়াকড়ির ঘোষণা দেয়, তখন আস্থার অভাবে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা সরিয়ে নিতে শুরু করে। জমিদারী কায়দায় কর আদায়ের চেষ্টা করলে অর্থনীতিতে 'শ্যাডো ইকোনমি' বা ছায়া অর্থনীতি বড় হয়। মানুষ ঘরে টাকা রাখা শুরু করলে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট দেখা দেয় এবং দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ও উৎপাদন ব্যাহত হয়। অর্থাৎ, রাজস্ব বাড়ানোর এই একপাক্ষিক চেষ্টা শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির জন্য 'বুমেরাং' হয়ে দাঁড়ায়।
সমাধান কোথায়?
১. সেবার মানসিকতা: এনবিআর-কে শাসক নয়, বরং সেবকের ভূমিকায় আসতে হবে। করদাতাকে ভয় দেখানো নয়, বরং সহায়তা করাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
২. সহজ 'এক্সিট' পলিসি: প্রবেশের চেয়ে বের হওয়ার পথ সহজ করতে হবে। আয় না থাকলে ফাইল বন্ধ করার প্রক্রিয়াটি হয়রানিহীন না হলে মানুষ নতুন ফাইল খুলতে ভয় পাবে।
৩. স্বচ্ছতা ও সম্মান: নিয়মিত করদাতাদের সামাজিক মর্যাদা ও বিশেষ নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
রাজস্ব আদায়ের আধুনিকায়ন কেবল সফটওয়্যারে নয়, বরং কর্মকর্তাদের মগজে থাকা জমিদারী মানসিকতা পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করছে। সিস্টেম যখন করদাতার ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক ক্ষতির কারণ না হয়ে 'সহায়ক' হিসেবে কাজ করবে, তখনই মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাষ্ট্রের অংশীদার হতে এগিয়ে আসবে। অন্যথায়, ৪ কোটি কেন, ১০ কোটি টিআইএন দিয়েও প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে না।