মহাকাশযান থেকে নেমে সোজা ঢাকায় এসে হাজির হয়েছে ভিনগ্রহের প্রাণী এলিয়েন কদম আলী। তার গায়ে অদ্ভুত এক আলোর পোশাক, আর কপালে দুটো অ্যান্টেনা ঝিলিক দিচ্ছে। অন্যদিকে, মিরপুরের ফুটপাথ দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে হেঁটে যাচ্ছিলেন বাস্তব কদম আলী—যিনি দীর্ঘ ত্রিশ বছর ধরে এ দেশের ব্যবসা ও ভ্যাট-বাজারের হালে পানি মেপে চলা এক পোড় খাওয়া মানুষ।
দুজনের চোখাচোখি হতেই শুরু হলো এক ভিনদেশি বনাম লৌকিক কদম আলীর অদ্ভুত এক কথোপকথন।
এলিয়েন কদম আলী তার অ্যান্টেনা দুটো নাড়তে নাড়তে খিকখিক করে হেসে উঠল। তারপর বলল, "কদম আলী ভাই, তোমাদের এই নীল গ্রহের মানুষগুলোর বুদ্ধিমত্তা দেখে আমার মাঝে মাঝে মহাকাশ যানের কম্পিউটার চিপেও শর্টসার্কিট হয়ে যায়! গ্যালাক্সির এ মাথা থেকে ও মাথা ঘুরে বেড়াই, কত শত সভ্যতার ট্যাক্স সিস্টেম দেখলাম। কিন্তু তোমাদের মতো এত আজব ভ্যাট আদায়ের সিস্টেম আমি এই বিশ্বে কোথাও দেখি নাই!"
বাস্তব কদম আলী ভ্রু কুঁচকে একটা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, "আজব মানে? আমাদের দেশের ভ্যাট সিস্টেম নিয়ে তোমার সমস্যা কী মিয়া? এনবিআর তো নিয়ম মেনেই কাজ করছে।"
এলিয়েন কদম আলী চোখ গোল গোল করে বলল, "সমস্যা কী মানে? ভাইরে ভাই, ব্যবসার করুণ অবস্থা, বাজারে চাল-ডালের আগুন দাম, মানুষের পকেট ফাঁকা—সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নাই। কর্তাব্যক্তিরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে বসে শুধু টার্গেট আর টার্গেট চিল চিৎকার করেন! ব্যবসায়ের অবস্থা বা সাধারণ ভোক্তার পেটে ভাত আছে কি না, তার কোনো বালাই নেই। শুধু জানো কীভাবে ভ্যাট টানতে হয়!"
বাস্তব কদম আলী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু হেসে হাত দুটো কলারের ওপর রাখলেন। তারপর বেশ গম্ভীর গলায় বললেন, "আরে এলিয়েন ভাই, তুমি ভিনগ্রহ থেকে এসে আমাদের দুনিয়ার অর্থনীতি বুঝবা কেমনে? আমাদের এখানে সিস্টেম সোজা—রাখ মিয়া তোমার ইমোশন আর সিস্টেম! ভ্যাট হলো একটা আইন, একটা বিধি। আইনের চোখে ব্যবসার কান্না বা ভোক্তার দীর্ঘশ্বাসের কোনো দাম নাই। আইন তার নিজের গতিতে চলবে, কালেকশন তার নিজের নিয়মে হবে। এখানে ব্যবসা বাঁচল কি মরল, সে চিন্তা করার কোনো অবকাশ বা ফুসরত কারও নাই।"
এলিয়েন কদম আলী তার অ্যান্টেনা সোজা করে একেবারে আকাশ থেকে পড়ার ভান করে বলল, "বলো কী! আইন কি মানুষের মঙ্গলের জন্য তৈরি হয় না, নাকি মানুষ আইনের গোলাম হয়ে বাঁচার জন্য জন্মায়? যে ব্যবসায় লাভই নাই, পুঁজি শেষ, সেই ব্যবসা থেকে জোর করে ভ্যাট তুলতে গেলে তো এক দিন আস্ত বাজারটাই থমকে দাঁড়াবে! তোমরা কি বোঝো না, ব্যবসা বাঁচলে তবেই না ভ্যাট আসবে?"
বাস্তব কদম আলী মাথার টুপিটা ঠিক করতে করতে বললেন, "বুঝি না কে বলেছে? সবই বুঝি। কিন্তু যারা চেয়ারে বসে হুকুম দেন, তাদের কাছে ব্যবসার লস বা ক্যাশ ফ্লো-র ব্যালেন্সশিট কোনো গুরুত্ব বহন করে না। তাদের খাতা মেলানো চাই। বস, এটা মহাকাশ নয়—এটা আমাদের চিরচেনা বাস্তব মাঠ। এখানে কর আদায়কারী আর ব্যবসায়ীর সম্পর্ক হলো শিকারী আর শিকারের মতো। লাভের গুড় কে খেল আর কে লোকসানে মরে গেল, তাতে খাতার পাতার অঙ্ক বদলায় না।"
এলিয়েন কদম আলী তখন মাথা নাড়তে নাড়তে তার মহাশূন্যের নোটপ্যাড বের করে কিছু একটা টাইপ করতে শুরু করল। তারপর বিড়বিড় করে বলল, "তাহলে তোমরাই বলছ, তোমাদের এই সিস্টেমে ভ্যাট হলো একধরনের অদৃশ্য চাবুক, যা কেবল মারতেই জানে, পিঠের চামড়া যে উঠে যাচ্ছে তা দেখে না।"
বাস্তব কদম আলী মুচকি হেসে কাঁধে হাত রেখে বললেন, "একদম ঠিক ধরেছ ভাই! এই চাবুকের বাড়ি খেয়েই আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা টিকে আছে, আবার অনেকে দেউলিয়া হয়ে সাইনবোর্ড নামিয়ে ঘরে বসেছে। এটাই আমাদের আধুনিক সভ্যতার রীতিনীতি।"
এলিয়েন কদম আলী তখন আর কথা বাড়াল না। সে কেবল দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে তার মহাকাশযানের দিকে হাঁটা ধরল এবং যাওয়ার সময় ফিসফিস করে বলে গেল, "যেখানে অর্থনীতির গতি আর মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার হিসাব করা হয় না, সে সমাজ বেশিদূর এগোতে পারে না ভাই!"