ফুটপাতের ধারের চায়ের দোকানের টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার শব্দ। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল কদম আলী। তার পাশেই মহাজাগতিক এক নভোযান থেকে নেমে আসা রহস্যময় ‘এলিয়েন’ বন্ধুটি বসে আছে মানুষের ছদ্মবেশে।
কদম আলী: (মাথায় হাত দিয়ে) ভাই রে, যে দেশে আয়করের সর্বনিম্ন পিয়ন বা মাঠপর্যায়ের সহকারী কর্মকর্তা পর্যন্ত দেশের সর্বসম্মানিত শীর্ষ করদাতার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, গুদামে বা কারখানায় ঢোকার জন্য কোনো নোটিশ বা পূর্বানুমতির প্রয়োজন মনে করে না—সে দেশে এই সাধারণ ব্যবসায়ীরা কীভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখেন, সেটাই আমার মাথায় ঢোকে না! আইনের বলে যেকোনো সময় অফিসে ঢুকে ফাইলপত্র তছরুপ করা বা ডিভাইস জব্দ করার এই সংস্কৃতি কোন যুগে বেঁচে আছে ভাই? এই দেশ ছেড়ে চলে যেতে ইচ্ছে করে।
এলিয়েন: (মহাজাগতিক চোখে তাকিয়ে মৃদু হেসে) কদম, তোদের এই অদ্ভুত গ্রহের হিসাব-নিকাশ বড়ই জটিল। অন্য গ্যালাক্সিতে তো সিস্টেম চলে স্বয়ংক্রিয় প্রটোকলে। কিন্তু তোদের এই দেশের ব্যবসায়ীদের নিয়ে আমার মাঝে মাঝে করুণাও হয়, আবার হাসিও পায়।
কদম আলী: করুণা কেন ভাই? ব্যবসায়ীরা কি শখ করে হেনস্তা হতে চায়? তারা তো দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি!
এলিয়েন: শখ করে না হোক, বোকামিতে তো বটেই! শোন কদম, তোদের দেশের ব্যবসায়ীদের যদি একটুও আত্মসম্মানবোধ বা লজ্জা থাকত, তবে তারা পচা ও ঔপনিবেশিক আমলের এই কালো আইনগুলোর বিরুদ্ধে বুক ফুলিয়ে, জোর গলায় কথা বলতে পারত। কিন্তু উনাদের সেই সৎসাহস বা নৈতিক জোরের বড় অভাব আছে।
কদম আলী: (অবাক হয়ে) বলিস কী এলিয়েন! ব্যবসায়ীরা তো সারাক্ষণই চিৎকার করে, স্মারকলিপি দেয়, আন্দোলন করে। তুই তাদের দুর্বলতা কোথায় দেখলি?
এলিয়েন: আসল দুর্বলতা হলো সুবিধাবাদিতা আর ভয়ের সংস্কৃতিতে, কদম। একটু গভերে তাকাও। সিংহভাগ ব্যবসায়ী চায় না যে ব্যবসা শতভাগ স্বচ্ছ বা ‘সিস্টেম ড্রাইভেন’ হোক। তারা আড়ালে-আবডালে ফাঁকফোকর রাখতে পছন্দ করে। আর এই দুর্বলতাটুকুই হলো রাজস্ব প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। চোর যদি নিজেই ঘরের দরজা খোলা রাখে, তবে প্রহরীর দোষ দিয়ে লাভ কী? ব্যবসায়ীরা যদি আইন মেনে একশ শতাংশ স্বচ্ছ থাকত, তবে কি কোনো মাঠের কর্মকর্তা ক্ষমতা দেখাতে পারত? তারা তো তখন আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বাধ্য হতো।
কদম আলী: কথা তো ফেলে দেওয়ার মতো নয় ভাই। আমাদের এখানে তো সমস্যা হলো—কেউ আইন মানতে চাইলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর এই ‘ইনস্পেকটর রাজ’ বা পরিদর্শক সংস্কৃতির কারণে টিকতে পারে না। কর্মকর্তা মাঠে নামলেই তো শুরু হয় ঘুষ আর হয়রানির অন্তহীন লঙ্কাডুবি।
এলিয়েন: ঠিক এখানেই তো তোদের সিস্টেমের মূল গলদ! আধুনিক বিশ্বে কর আদায় হয় ডেটা অ্যানালিটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আর সম্পূর্ণ অটোমেশনের মাধ্যমে। কার কারখানায় কী উৎপাদন হচ্ছে, আর কত কর আসার কথা—তা তো সার্ভারেই পলকে দেখা যাওয়ার কথা। সেখানে মানুষের গায়ের জোরে মাঠে লোক পাঠিয়ে জঙ্গল কায়দায় ভীতি সৃষ্টির অর্থ হলো দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া। তোদের ব্যবসায়ীরা এই মৌলিক ডিজিটাল অধিকার বা সিস্টেম সংস্কারের দাবি জোরালোভাবে তোলার চেয়ে একেকজন ব্যক্তিগতভাবে ‘ম্যানেজ’ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এই আপসকামিতাই তাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে।
কদম আলী: তাহলে কি এই চক্র থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই? এভাবে কি চিরকাল ব্যবসা চলবে?
এলিয়েন: উপায় একটাই, কদম। যতক্ষণ না ব্যবসায়ীরা নিজেরা কোমর বেঁধে রুখে দাঁড়িয়ে বলবেন—‘মাঠে লোক পাঠিয়ে হয়রানি বন্ধ করো, পুরো কর ব্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বা ডিজিটাল করো’—ততক্ষণ এই অপমান ঘুচবে না। যতদিন তারা চোরের দশ দিন আর গৃহস্থের এক দিনের ভরসায় বসে থাকবেন, ততদিন এই মহাজাগতিক তামাশা দেখতেই হবে। লজ্জা ঢাকতে হলে আগে ঘরের ময়লা নিজের হাতে পরিষ্কার করতে হয়, অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে লাভ নেই।