রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হয়রানি ও কনসালট্যান্টের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচারের অভিযোগ
রাজস্ব ফাঁকি ও জালিয়াতির অভিযোগে ইউনাইটেড টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, রাজশাহী কর্তৃক ৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকার অধিক অর্থদণ্ডের চূড়ান্ত আদেশ জারির পর পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। আইনি লড়াইয়ে বড় অংকের প্রত্যক্ষ কর বা ভ্যাট পরিশোধের হাত থেকে প্রতিষ্ঠানকে রক্ষা করার পর কনসালট্যান্টের পেশাগত সম্মানী ও চুক্তি নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল দ্বন্দ্ব। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে এবং সংঘবদ্ধ ব্যক্তিদের নিয়ে নানা ধরনের মহড়া ও চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
মামলার পটভূমি ও কমিশনারের চূড়ান্ত রায়
ভ্যাট গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের ঝটিকা অভিযানে পাবনার ঈশ্বরদীর মুলাডুলিতে অবস্থিত ইউনাইটেড টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রিজে অবৈধ সিগারেট উৎপাদন এবং বিপুল পরিমাণ নকল ব্যান্ডরোল ও স্ট্যাম্প ব্যবহারের সত্যতা মেলে। সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের পরীক্ষণে জব্দকৃত স্ট্যাম্প ও ব্যান্ডরোলগুলো জাল বলে প্রমাণিত হয়।
কমিশনারের ১৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখের চূড়ান্ত আদেশ অনুযায়ী, উৎপাদিত সিগারেটে নকল স্ট্যাম্প ব্যবহারের অপরাধে ৩১,৬০,১৫৮.৬০ টাকা মূসক ও সম্পূরক শুল্ক ফাঁকি প্রমাণিত হয় এবং ৩১ লাখ টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়। একইসঙ্গে, গোডাউনে মজুতকৃত অব্যবহৃত ৯,২৪,২৮,৮০০ টাকার জাল ব্যান্ডরোল দিয়ে রাজস্ব ফাঁকির অপচেষ্টা করায় ৫ কোটি টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়। সব মিলিয়ে মামলায় ৯,৫৫,৮৮,৯৫৪.৬০ টাকার আর্থিক দায় নির্ধারণ করা হয়, যার বিপরীতে প্রতিষ্ঠান ইতিপূর্বে ৩৪,৫৬,৭৪৮ টাকা জমা দেয়।
কনসালট্যান্টের আইনি সাফল্য ও সেভিংস
এই জটিল ভ্যাট বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রতিষ্ঠানটি 'দ্য রিয়েল কনসালটেশন (TRC)'-এর সিইও এবং প্রতিষ্ঠাতা মোঃ আলীমুজ্জামানের সাথে পেশাগত চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। চুক্তি অনুযায়ী কারখানা সচল করা এবং দাবিকৃত অর্থ সাশ্রয় বা আইনি নিষ্পত্তির লক্ষ্য ছিল।
কনসালট্যান্টের সুচিন্তিত লিখিত জবাব এবং ব্যক্তিগত শুনানিতে উপস্থাপিত জোরালো আইনি যুক্তির ফলেই গোডাউনে জব্দকৃত ৯.২৪ কোটি টাকার অব্যবহৃত জাল ব্যান্ডরোলের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটিকে কোনো প্রত্যক্ষ রাজস্ব বা ভ্যাট পরিশোধ করতে হয়নি। কমিশনারের আদেশেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কারণ দর্শানোর জবাব ও শুনানির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেই এই রায় দেওয়া হয়েছে। ট্যাক্স কনসালট্যান্সির মানদণ্ডে মূল দাবিনামার একটি বিশাল অংশকে সরাসরি প্রত্যক্ষ কর পরিশোধের হাত থেকে বাঁচানোকে অন্যতম সফল আইনি "সেভিংস" বা সাশ্রয় হিসেবে গণ্য করা হয়।
থানায় লিখিত জবাব ও স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে হয়রানির অভিযোগ
এদিকে মামলার রায় গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে হাতে পাওয়ার পর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে দূরত্ব তীব্র আকার ধারণ করে। ক্লায়েন্টের পক্ষ থেকে কনসালট্যান্ট মো. আলীমুজ্জামানের বিরুদ্ধে থানায় প্রতারণার একটি মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করা হয়। এর বিপরীতে পল্লবী থানার তদন্ত কর্মকর্তার নিকট লিখিত জবাব দাখিল করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
লিখিত জবাবে উল্লেখ করা হয় যে, ১ কোটি ১০ লাখ টাকার ওই চুক্তিটি সম্পূর্ণ প্রোপাইটরশিপ ভিত্তিতে পরিচালিত ছিল এবং কাজের বিভিন্ন ধাপে কনসালট্যান্টকে মোট ১৬ লাখ টাকা অগ্রিম দেওয়া হয়। পরবর্তীতে গত ১১ ডিসেম্বর ২০২৬ তারিখে ক্লায়েন্ট নিজেই এসএমএস-এর মাধ্যমে একতরফাভাবে চুক্তি বাতিল করেন। কুরিয়ার যোগে বিল পাঠানোর পর থেকেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে অবৈধভাবে অগ্রিম টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, হুমকি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে গত ১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বহিরাগত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের অফিসে পাঠানো হয় এবং পরবর্তীতে 'র্যাব' পরিচয়ে ফোন করে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এসকল ঘটনায় জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং আইনি সততার প্রমাণস্বরূপ পূর্বেই ১৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখে পল্লবী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এন্ট্রি করা হয়।
তদন্তে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, এই ব্যবসায়িক ও চুক্তিগত বিরোধকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে বর্তমানে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে এবং সংঘবদ্ধ ব্যক্তিদের মাধ্যমে নানা ধরনের পেশিশক্তি প্রদর্শন বা মহড়া দেওয়া হচ্ছে। একটি দেওয়ানি প্রকৃতির চুক্তিগত বিরোধকে (Breach of Contract) ফৌজদারি রূপ দিয়ে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হয়রানি করার এই অপচেষ্টা আমলে না নিয়ে আইনগতভাবে সমাধানের জন্য প্রশাসনের নিকট জোর দাবি জানানো হয়েছে।