অর্থ মন্ত্রীর সাথে ভিডিওর ওই ব্যবসায়ী আবেগে অনেক কথা বলেছেন, কিন্তু সমাধানের সূত্রটা কোথায়?
চলুন, এলিয়েন কদম আলী আর আমাদের মর্ত্যের বাস্তব কদম আলীর মধ্যে একটা জম্পেশ "রসালা" বৈঠক বসানো যাক। চায়ের কাপে তুফান তুলে তারা এফবিসিসিআই আর অর্থমন্ত্রীর সেই মহাকাব্যিক আলোচনা ব্যবচ্ছেদ করছে।
এলিয়েন কদম আলী ও বাস্তব কদম আলীর "বাজেট-বিপ্লব" ও অর্থমন্ত্রীর সাথে এফবিসিসিআই এর বৈঠক।
স্থান:কদম আলীর টং দোকান (যেখানে ভ্যাট নাই, কিন্তু আড্ডা আছে)।
সময়: কালবৈশাখী ঝড়ের আগের গুমোট বিকেল।
বাস্তব কদম আলী:** (স্মার্টফোনে ভিডিওটা দেখিয়ে) দেখলি এলিয়েন ভাই? লোকটা তো এক্কেরে কলিজা ছিঁড়ে কথা কইছে! বলছে—"আমি চুরি করি, আপনি আমাকে বাধ্য করছেন!" আহা! কী দরদ! বুকটা ফেটে যাচ্ছে রে ভাই। এই এনবিআর আর আমলাতন্ত্র আমাদের মত ব্যবসায়ীদের এক্কেরে "সিস্টেমেটিক চোর" বানাইয়া ছাড়ল!
এলিয়েন কদম আলী:(তার এন্টেনা দুটো একটু কাঁপিয়ে) কদম ভাই, দরদ দিয়ে তো আর ডিজিটাল বাংলাদেশ চলবে না, চলবে লজিক দিয়ে। লোকটা যা বলছে তা হলো "লক্ষণ" (Symptom), কিন্তু অসুখটা অন্য জায়গায়। তুমি প্যারাসিটামল খেয়ে জ্বর কমানোর চেষ্টা করছ, কিন্তু শরীরে যে বড় একটা ফ্রেমওয়ার্কের টিউমার হয়ে আছে, সেটা তো দেখছ না!
বাস্তব কদম আলী:(বিস্মিত হয়ে) কস কী? ফ্রেমওয়ার্ক আবার কী? অর্থমন্ত্রী তো বলল হাজার হাজার ইএফডি (EFD) মেশিন বসাবে। অটোমেশন হবে, সব কম্পিউটার টিপলেই কেল্লাফতে! চোর ধরার জন্য তো মেশিনই যথেষ্ট, নাকি?
এলিয়েন কদম আলী:(হেসে কুটিপাটি) হাহাহা! কদম ভাই, তুমি তো দেখছি সেই মান্ধাতা আমলের এলিয়েন রয়ে গেলে! শোনো, ফ্রেমওয়ার্ক ছাড়া অটোমেশন হলো—গাধার গায়ে ফেরারি গাড়ির ইঞ্জিন লাগানো।গাধা কি তখন ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার দৌড়াবে? না! ওটা উল্টে গিয়ে আরও বড় অ্যাক্সিডেন্ট করবে।
বাস্তব কদম আলী: মানে? একটু খোলসা করে বল তো দেখি।
এলিয়েন কদম আলী: দেখো, ভিডিওর ওই লোকটা যে বলছে—"পাশের দোকান ভ্যাট দেয় না, আমি দিলে মরবো"—এটা কেন হচ্ছে? কারণ তোমাদের সিস্টেমে কোনো লেভেল প্লেইং ফিল্ড' নেই। এখন তুমি যদি এই ভাঙা রাস্তার ওপর একটা চকচকে অটোমেশন মেশিন বসিয়ে দাও, লাভ কী? মেশিন তো শুধু ওই সৎ লোকটাকেই ধরবে যে সিস্টেমে ঢুকেছে। আর যে সিস্টেমের বাইরে, সে তো আগের মতোই হাওয়া খেয়ে বেড়াবে!
বাস্তব কদম আলী:ওহ! তার মানে আগে আইন আর নিয়ম কানুন দিয়ে সবার জন্য সমান একটা রাস্তা বা ফ্রেমওয়ার্ক'বানাতে হবে?
এলিয়েন কদম আলী:এক্কেবারে টু দ্য পয়েন্ট! তোমাদের ওই ট্রিপল হিটের কথা চিন্তা করো—ভ্যাট, ডলারের দাম আর ব্যাংকের সুদ। এই তিনটার কোনো সুনির্দিষ্ট ফ্রেমওয়ার্ক নেই। আজ এই নিয়ম, কাল ওই এসআরও (SRO)। এই যে "পারসন-ডিপেন্ডেন্ট" পাগলামি, এটাই তো আসল সমস্যা। যখন একজন আমলা বা কর্মকর্তার মর্জির ওপর ব্যবসায়ীর ভাগ্য ঝুলে থাকে, তখনই তো "আন্ডারস্ট্যান্ডিং" এর জন্ম হয়।
বাস্তব কদম আলী: বুঝলাম। তার মানে তুমি বলতে চাইছ, এফবিসিসিআই আর অর্থমন্ত্রী যখন বসে, তখন তারা শুধু 'ট্যাক্স কত পারসেন্ট হবে' তা নিয়ে মারামারি করে। কিন্তু 'প্রসেসটা কেমন হবে' তা নিয়ে কেউ কথা বলে না?
এলিয়েন কদম আলী: হুবহু! তারা সবাই বলে—"মেশিন আনো, অটোমেশন করো!" আরে ভাই, মেশিন তো শুধু ইনপুট আর আউটপুট চেনে। তোমার ইনপুট যদি হয় দুর্নীতির ফ্রেমওয়ার্ক, তবে আউটপুট আসবে "ডিজিটাল দুর্নীতি"। আগে দরকার সিস্টেম ট্রাস্ট"। ব্যবসায়ী জানবে—আমি ১০ টাকা দিলে সেটা অটোমেটিক সরকারি কোষে যাবে, মাঝপথে কোনো কদম আলী বা আমলা সেটা পকেটে ভরবে না। এই ভরসাটাই হলো ফ্রেমওয়ার্ক।
বাস্তব কদম আলী: আচ্ছা এলিয়েন ভাই, ভিডিওতে ওই লোকটা যে বলল—"ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর জন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট রাখা কঠিন"—এটার সমাধান কী?
এলিয়েন কদম আলী: এটাও ফ্রেমওয়ার্কের অভাব। তুমি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর ওপর কর্পোরেট কমপ্লায়েন্সের জোয়াল চাপিয়ে দিচ্ছ। কেন? কারণ তোমার আইনটা সবার জন্য একরকম ভাবে ডিজাইন করা হয়নি। আপনার বস যেটাকে বলেন— পেইন পয়েন্ট ডায়াগনোসিস"। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার পেইন পয়েন্ট হলো জটিল হিসাব-নিকাশ। ফ্রেমওয়ার্কটা এমন হওয়া উচিত ছিল যাতে মোবাইলে একটা ক্লিক করলেই তার ভ্যাট-ট্যাক্স সব মিটে যায়। একেই বলে পিপল-সেন্ট্রিক ডিজাইন":
বাস্তব কদম আলী:(দীর্ঘশ্বাস ফেলে) তার মানে অর্থমন্ত্রী আর ব্যবসায়ীদের এই অচলদশা চলতেই থাকবে?
এলিয়েন কদম আলী: চলবেই তো! যতক্ষণ না তারা ওই "ইমোশনাল অডিটিং" করছে। অর্থমন্ত্রী ভাবছেন ব্যবসায়ীরা টাকা লুকায়, আর ব্যবসায়ীরা ভাবছে সরকার তাদের রক্ত চুষে খাচ্ছে। এই অবিশ্বাসের মাঝখানে অটোমেশন হলো অনেকটা বিষাক্ত ক্ষতে মেকআপ লাগানোর মতো। দেখতে সুন্দর লাগবে, কিন্তু ভেতরটা পচতেই থাকবে।
বাস্তব কদম আলী: তাহলে সমাধানটা কী? তুই যদি অর্থমন্ত্রী হতিস কী করতিস?
এলিয়েন কদম আলী:** আমি আগে একটা
জিরো-হিউম্যান ইন্টারফেস" ফ্রেমওয়ার্ক বানাতাম। কোনো ব্যবসায়ীকে কোনো অফিসে যেতে হবে না। কিন্তু তার আগে আইনগুলোকে এমন সহজ করতাম যাতে একজন প্রাইমারি স্কুল পাস কদম আলীও বুঝতে পারে তার কত টাকা ভ্যাট দিতে হবে। ভ্যাট হবে ইনক্লুসিভ—যেমনটা তোমাদের ওই ৫% ভ্যাটের ক্যাম্পেইন চলছে। ক্রেতা জানবে সে ভ্যাট দিচ্ছে, বিক্রেতা জানবে সে ভ্যাট জমা দিচ্ছে—মাঝখানে কোনো "চুরি করার সুযোগ" বা "চুরি করতে বাধ্য করার" ফ্রেমওয়ার্কই থাকবে না।
বাস্তব কদম আলী: তার মানে, **"আগে ফ্রেমওয়ার্কের শুদ্ধি, তারপর অটোমেশনের বুদ্ধি!"
এলিয়েন কদম আলী:কদম ভাই, তুমি তো দেখি কবি হয়ে গেলে! ঠিক তাই। অটোমেশন হলো শুধু একটা টুল। কিন্তু সেই টুলটা চালানোর জন্য যে মানসিকতা আর আইনি কাঠামো দরকার, সেটা নেই বলেই ওই ব্যবসায়ী টিভির পর্দায় এসে চ্যাঁচামেচি করছে। সিস্টেম যদি স্বচ্ছ হতো, তাকে বুক চাপড়ে বলতে হতো না—"আমি চুরি করি!" সে গর্ব করে বলত—"আমি ভ্যাট দেই, কারণ আমি জানি আমার টাকা দিয়ে দেশ চলছে এবং আমার সাথে অন্যায় হচ্ছে না।"
বাস্তব কদম আলী: বুঝলাম। তার মানে এফবিসিসিআই আর এনবিআরের লড়াইটা আসলে অন্ধের হাতি দেখার মতো। একজন লেজ ধরছে, একজন কান ধরছে—কেউ পুরো হাতিটাকে (মানে ফ্রেমওয়ার্কটাকে) দেখছে না!
এলিয়েন কদম আলী:একদম! তাই এখন দরকার একটা ট্রাস্ট-বেজড সিস্টেম"। যেখানে সিস্টেমই হবে রক্ষক। কোনো আমলা বা নেতার কাছে ধরণা দিতে হবে না। একেই বলে সত্যিকারের ডিজিটাল ফিসক্যাল পলিসি।
কদম আলীর সারসংক্ষেপ:
১. ফলো ফ্রেমওয়ার্ক:অটোমেশনের আগে আইনি ও পদ্ধতিগত সংস্কার মাস্ট।
২. সিস্টেম ট্রাস্ট:মানুষ নয়, সিস্টেমের ওপর ভরসা তৈরি করতে হবে।
৩. ইমোশনাল অডিট:ব্যবসায়ীদের ক্ষোভকে শুধু 'চুরি' হিসেবে না দেখে তাদের সমস্যার মূল কারণ (পেইন পয়েন্ট) খুঁজে বের করতে হবে।
৪. লেভেল প্লেইং ফিল্ড:আইন সবার জন্য সমান ভাবে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা—তা না হলে অটোমেশন হবে শুধু মুষ্টিমেয় কয়েকজনকে ধরার অস্ত্র।
বাস্তব কদম আলী:এলিয়েন ভাই, তুই তো পুরা বস হয়ে গেছিস! চল, এখন এই ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে একটা গান বানাই, যাতে সাধারণ মানুষও বোঝে—কেন শুধু মেশিন বসিয়ে উন্নয়ন সম্ভব না!
এলিয়েন কদম আলী:হাহাহা! গান তো হবেই, তার আগে চায়ের বিলটা তো দাও—নাকি এখানেও ভ্যাট নিয়ে "আন্ডারস্ট্যান্ডিং" করবা?