নাগরিকদের কর প্রদানে উৎসাহিত করতে ভবিষ্যতে আয়কর রসিদেই জানিয়ে দেওয়া হবে করের অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেছেন, করদাতারা তখনই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর দিতে আগ্রহী হবেন, যখন তারা বুঝতে পারবেন রাষ্ট্র তাদের করের বিনিময়ে কী ধরনের সেবা দিচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাজধানীর কাওরান বাজারে সিএ ভবনে অনুষ্ঠিত এক প্রাক-বাজেট গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) ও ইংরেজি দৈনিক দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেস যৌথভাবে এ আলোচনার আয়োজন করে।
ড. তিতুমীর বলেন, আগামী বাজেট থেকেই এমন একটি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে করদাতাকে দেওয়া রসিদে উল্লেখ থাকবে— তার পরিশোধিত করের কত অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় হয়েছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে সামাজিক আস্থার সম্পর্ক গড়ে না উঠলে কর ফাঁকি ও কর জালিয়াতি কমানো সম্ভব নয়। দেশে কর ফাঁকি ও জালিয়াতির পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতিকে দায়ী করে তিনি বলেন, গোষ্ঠীতান্ত্রিক শক্তিকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে কর খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কর ফাঁকি ও জালিয়াতির মূল শেকড় এখানেই।
বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি বিশ্বের অন্যতম নিম্ন হার। উন্নয়নের নানা দাবি করা হলেও করব্যবস্থার ভিত্তি এখনও দুর্বল রয়ে গেছে।
কর ব্যবস্থায় ‘সংযুক্তি’ ও ‘বিযুক্তি’—এই দুই ধরনের সংস্কারের কথা তুলে ধরে ড. তিতুমীর বলেন, ‘বিযুক্তি’ বলতে করদাতা ও কর কর্মকর্তার ব্যক্তিগত যোগাযোগ কমিয়ে আনা বোঝায়, আর ‘সংযুক্তি’ হচ্ছে করদাতাকে জানানো যে তার করের অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার করের হার বাড়ানোর পথে হাঁটতে চায় না। বরং অর্থনীতির পরিধি বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়াতে চায়। তার মতে, প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি।
অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে সরকার ইতোমধ্যে তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, অনানুষ্ঠানিক খাতকে মূল অর্থনীতির আওতায় আনা, বন্ধ শিল্পকারখানা চালু করা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে প্রণোদনা দেওয়া এবং এসএমই নীতিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এক গ্রাম, এক পণ্য’ উদ্যোগের মাধ্যমে সমতাভিত্তিক আঞ্চলিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সৃজনশীল অর্থনীতি বা ‘অরেঞ্জ ইকোনমি’কে গুরুত্ব দিয়ে শিল্পী, ডিজাইনার, গেম নির্মাতা ও ফ্যাশন উদ্যোক্তাদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. তিতুমীর বলেন, রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি। বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে বাংলাদেশ ব্যাংক রিফাইন্যান্সিং স্কিম ও বিশেষ ঋণ কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল, মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান, অ্যামচেম সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ, আইসিএবি সভাপতি এন কে এ মবিন এবং দ্য ফাইনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ।দেশের কর ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়াতে এবার ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) পৌঁছে দিতে চাওয়া হচ্ছে গ্রাম পর্যন্ত। লক্ষ্য—দেশের বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতিকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা এবং দীর্ঘদিনের নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রথমবারের মতো উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ের ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও সরাসরি ভ্যাটের আওতায় আসবেন। তবে এর সম্ভাবনা যেমন বড়, তেমনই ঝুঁকিও কম নয়—এমনটাই বলছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।
‘টোকেন ভ্যাট’: সহজ প্রবেশ নাকি পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি?
এনবিআরের পরিকল্পনায় রয়েছে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য মাসিক ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার একটি ‘টোকেন ভ্যাট’ চালু করা। মূল উদ্দেশ্য—ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের কর প্রদানে অভ্যস্ত করা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানো। কিন্তু এই প্রস্তাব অনেকের কাছে পুরোনো ‘প্যাকেজ ভ্যাট’ ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি বলেই মনে হচ্ছে। অতীতে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-ব্যবসায়ী যোগসাজশের কারণে সেই ব্যবস্থা বাতিল হয়েছিল। ফলে নতুন করে একই ধরনের কাঠামো চালু হলে সুশাসন নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিআইএন বাধ্যতামূলক: কর জালে আনতে নতুন হাতিয়ার
পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে ব্যাংক হিসাব পরিচালনা ও ট্রেড লাইসেন্স পেতে বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (বিআইএন) বাধ্যতামূলক করা। এর মাধ্যমে কর প্রশাসন সরাসরি ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৮ লাখ প্রতিষ্ঠানের বিআইএন থাকলেও নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন দেয় মাত্র ৫ লাখের কিছু বেশি প্রতিষ্ঠান। অথচ অর্থনৈতিক ইউনিট রয়েছে প্রায় ১.১৭ কোটি, যার ৯৯ শতাংশই ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প এবং এর বড় অংশ গ্রামে অবস্থিত।
এই বাস্তবতায় এনবিআর মনে করছে, করের আওতা বাড়ানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ লুকিয়ে আছে গ্রামীণ অর্থনীতির মধ্যেই।
কর-জিডিপি অনুপাত: দীর্ঘদিনের দুর্বলতা কাটানোর চেষ্টা
বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম কম। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচির শর্তও রাজস্ব বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে। এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু কর অব্যাহতি কমালেই হবে না—করদাতার সংখ্যা বাড়ানোই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। সেই জায়গা থেকেই গ্রামীণ ভ্যাট সম্প্রসারণের এই উদ্যোগ।
ব্যবসায়ীদের সমর্থন, তবে সতর্কতার আহ্বান
নীতিগতভাবে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বাস্তবায়ন নিয়ে সতর্ক করছেন অর্থনীতিবিদরা। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অল্প অঙ্কের ভ্যাট সংগ্রহ সম্ভব হলেও সেটি যেন হয় স্বচ্ছ ও ঝামেলামুক্ত। তার মতে, “কর আদায়ের নামে অতিরিক্ত অনানুষ্ঠানিক খরচ বা হয়রানি তৈরি হলে পুরো উদ্যোগই ব্যর্থ হতে পারে।” একইভাবে ব্যবসায়ী নেতারাও বলছেন, হঠাৎ করে বিআইএন বাধ্যতামূলক করলে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ট্রেড লাইসেন্স নবায়নেই নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
রাজস্বের ভৌগোলিক বৈষম্য: ঢাকার বাইরে বিশাল সম্ভাবনা
বর্তমানে দেশের মোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রায় ৪৫ শতাংশ ঢাকা ও চট্টগ্রামে হলেও, রাজস্বের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে এই দুই অঞ্চল থেকে। অর্থাৎ দেশের বড় একটি অংশ এখনও কার্যত করের বাইরে।
এই বৈষম্য কমাতে গ্রামীণ ভ্যাট সম্প্রসারণ কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে তারা বলছেন, এটি ধাপে ধাপে ৪ থেকে ৫ বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা উচিত।
বাস্তবতা: তথ্য ঘাটতি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা
এই পরিকল্পনার বড় বাধা হতে পারে তথ্যের অভাব। দেশের ব্যাংকিং খাতে ১৭ কোটির বেশি হিসাব থাকলেও কতগুলো ব্যবসায়িক হিসাব—তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। একইভাবে ট্রেড লাইসেন্সধারী সক্রিয় ব্যবসার সংখ্যাও স্পষ্ট নয়। এই পরিস্থিতিতে ভ্যাটের আওতা বাড়াতে গেলে আগে একটি নির্ভরযোগ্য ডাটাবেজ তৈরি করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সুযোগ বনাম ঝুঁকি
গ্রামীণ অর্থনীতিকে কর ব্যবস্থায় আনা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী উদ্যোগ। এতে রাজস্ব বাড়বে, অর্থনীতির আনুষ্ঠানিকীকরণ হবে এবং নীতিনির্ধারণ আরও তথ্যভিত্তিক হতে পারবে। তবে বাস্তবায়নে যদি অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি হয়, মাঠপর্যায়ে দুর্নীতি বাড়ে বা ছোট ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হয়—তাহলে এর উল্টো প্রভাবও পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনবিআরের এই উদ্যোগ আসলে একটি বড় নীতিগত পরিবর্তনের সূচনা। এটি সফল করতে হলে প্রয়োজন ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন, ডিজিটাল ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়ক পরিবেশ। অন্যথায় রাজস্ব বাড়ানোর এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে গিয়ে নতুন জটিলতার জন্ম দিতে পারে।