বাস্তব কদম আলী ছাদে পায়চারি করছেন আর মনে মনে বিড়বিড় করছেন, "আসুক আজ সালা এলিয়েনের বাচ্চা! ওই দিন তো পরকীয়া আর চার বিয়ার রসালো গল্প শুনাইয়া পলাইল। আজ হিসাব নিমু।" ঠিক তখনই একটা মৃদু শিস কাটার আওয়াজ করে ছাদের ওপর ল্যান্ড করল এলিয়েন কদম আলীর স্পেসশিপ।
এলিয়েন কদম আলী: কী খবর বাস্তব কদম ভাই! দূর থেকে দেখলাম তোমার মাথার এন্টেনা—আইন মানে, তোমার মগজ তো পুরা গরম হইয়া লাল বাতি জ্বলতাছে! আজ আবার কী হইলো? নতুন কোনো ট্যাক্সের নোটিশ আইছে নাকি?
বাস্তব কদম আলী: আসো আসো, সালা এলিয়েনের বাচ্চা আসো! ওই দিন তো পরকীয়ার রসালো আলাপ জমাইয়া, চার বউয়ের নামে ফ্ল্যাট ভাগ করার বুদ্ধি দিয়া পগার পার হইছিলা। সারা রাত ভাইবা দেখলাম, ওইসব আকাম-কুকাম আমারে দিয়া হইবো না। আমি হইলাম খাঁটি সৎ করদাতা। কিন্তু আসল কথাটা তো ওই দিন এড়াইয়া গেলা!
এলিয়েন কদম আলী: আরে কদম ভাই, রাগ করো কেন? ভিনগ্রহের মেহমানরে কেউ ‘সালা’ বলে গালাগাল করে? আমরা তো ব্রাদার্স! তা কোন আসল কথার কথা বলতেছ?
বাস্তব কদম আলী:ওই দিন যে বললা তোমাদের গ্রহে কোনো ট্যাক্স নাই, বাজেট নাই—আজ সত্যি করে বলো তো, আসলেই কি নাই? নাকি ট্যাক্স দিলেও তার বদলে তোমরা নাগরিক সুবিধা পাও? আর আমাদের এইখানে আমরা দিন-রাত ঘাম ঝরাইয়া ট্যাক্স দিই, কিন্তু বিনিময়ে আমরা কী পাই? সাঙ্গাত, আজ এইটার একটা ফয়সালা কইরা যাও!
এলিয়েন কদম আলী: ওহ, এই কথা! আচ্ছা, একটু খুইলাই বলি শোনো। আমাদের ওই মঙ্গলের চার নম্বর গ্যালাক্সিতে ট্যাক্স যে একেবারে নাই, তা কিন্তু না। তবে সিস্টেমটা আলাদা। আমাদের ওখানে যদি কেউ জমি কেনে বা ফ্ল্যাট বানায়, তবে সরকার তাকে উল্টা ধন্যবাদ জানায়। আর ট্যাক্স যেটা নেওয়া হয়, সেটা হইলো ‘সুবিধার অগ্রিম বুকিং’।
বাস্তব কদম আলী:সুবিধার অগ্রিম বুকিং? সেটা আবার কী রকম?
এলিয়েন কদম আলী: আমাদের গ্রহে যখন একজন নাগরিক ১ টাকা ট্যাক্স দেয়, সরকার তারে ১০ টাকার নিরাপত্তা আর শান্তি ফেরত দেয়। যেমন ধরো, আমাদের ওখানে রাস্তাঘাটে কোনো জ্যাম নাই। জ্যামে পইড়া কোনো এলিয়েনের আয়ু কমে না। যদি কোনো রাস্তা ভাঙা থাকে, তবে নাগরিকের ট্যাক্স দেওয়া লাগবে না—উল্টা সরকার নাগরিকরে ক্ষতিপূরণ দেয়! আমাদের চিকিৎসা একদম ফ্রি, পোলাপানের পড়াশোনা ফ্রি। বুড়া বয়সে কোনো এলিয়েন যদি কামাই করতে না পারে, তবে সরকার তারে প্রতি মাসে উন্নতমানের ‘স্পেস-জুস’ আর পকেট খরচ ফ্রিতে বাসায় পাঠাইয়া দেয়। অর্থাৎ, ট্যাক্স দিলে আমরা বুঝি যে আমরা দেশের মালিক!
*বাস্তব কদম আলী:* (একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে) শুনলা তো? নিজের কানে শুনলা তো মেঘের দল? আর আমাদের এইখানে? আমরা কি পাই?
এলিয়েন কদম আলী: কেন কদম ভাই, তোমরা কী পাও? তোমাদের ঢাকা শহরে তো কত সুন্দর সুন্দর ফ্লাইওভার, বড় বড় দালানকোঠা...
বাস্তব কদম আলী: থামো মিয়া, ফ্লাইওভার চিবাইয়া খামু? আমি বহু সাধ করে জমি কিনলাম, রেজিস্ট্রির সময় গামছা নিঙড়ানো ট্যাক্স দিলাম, সাইনিং মানিতে ১৫% দিলাম, এখন নিজের ভাগের ৫টা ফ্ল্যাট বুঝে নিতে গেলে আবার ১৫% ট্যাক্স! এত ট্যাক্স দেওয়ার পর যখন আমি ঘর থেকে রাস্তায় নামি, তখন কী পাই? প্রথম কদমেই পা পড়ে ম্যানহোলের খোলা ঢাকনায়! একটু বৃষ্টি হইলেই মিরপুরের রাস্তায় কোমর পানি জমে, মনে হয় বুড়িগঙ্গা নদী আমাদের দেখতে বাসায় চইলা আইছে! চার ঘণ্টার জ্যামে পইড়া গাড়ির ভেতরেই মানুষের যৌবন পার হইয়া বুড়া বয়স চইলা আসে।
এলিয়েন কদম আলী: তা ঠিক বলছ কদম ভাই। আমি উপর থেকে টেলিস্কোপে দেখি, তোমাদের জ্যামের ঠেলায় গাড়ির চাকাও কাঁদে!
বাস্তব কদম আলী: শুধু কি জ্যাম? সরকারি হাসপাতালে যাও, ট্যাক্সপেয়ার হিসেবে কোনো সিট পাবা না। দালালের পা ধরতে ধরতে জুতার তলা ক্ষয় হইয়া যাবে। পোলাপানরে ভালো স্কুলে পড়াইতে যাও—লাখ লাখ টাকা ডোনেশন আর কোচিংয়ের ফি দিতে দিতে বাপের হাড্ডি শেষ! তার ওপর যদি রাত-বিরাতে একটু শান্তিতে ঘুমাতে চাই, মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হইতে হয়। মশা মারার ওষুধ কেনার টাকাও তো আমাদের ট্যাক্সের টাকা থেকেই যায়, কিন্তু মশারা সেই ওষুধ খেয়ে আরও বেশি শক্তিশালী হইয়া ডাবল ডানা দিয়া ওড়ে! আমাদের অবস্থা হইছে—ট্যাক্স দেওয়ার সময় আমরা ‘ভিআইপি নাগরিকে’, আর সুবিধা চাওয়ার সময় আমরা ‘খাইয়া দাইয়া কাম নাই’ পাবলিক!
এলিয়েন কদম আলী: তার মানে কদম ভাই, তোমরা ট্যাক্স দিয়া পাও—ধুলোবালি, মশার কামড়, জ্যামের ক্লান্তি আর ফ্রি-তে একটু ওয়াটার কিংডমের ফিলিং, মানে রাস্তার জলবদ্ধতা! ঠিক না?
বাস্তব কদম আলী: একদম ঠিক বলছ। আর সবচেয়ে বড় সুবিধা কী জানো? এই যে ডাবল-ট্রিপল ট্যাক্সেশনের বোঝা মাথায় নিয়াও আমরা যে এখনো হার্ট অ্যাটাক না করে জ্যান্ত আছি, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পুরস্কার! যারা চুরি-চামারি করে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করতেছে, কানাডায় বেগম পাড়া বানাচ্ছে, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম করতেছে—তারা আছে মহাসুখে। আর আমার মতো সৎ কদম আলী বউয়ের কাছে মার খায়।
এলিয়েন কদম আলী: আহা কদম ভাই, মনটা খারাপ কইরো না। তোমাদের এই সিস্টেমটাই আসলে উল্টা। সৎ মানুষের পকেট কাটো, আর অসৎ মানুষদের লাল গালিচা বিছাও! তবে একটা কথা বলি, আমাদের গ্রহে কিন্তু একটা নিয়ম আছে—কোনো এলিয়েন যদি পরকীয়া করে ধরা খায়, তবে তার সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে সৎ এলিয়েনদের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া হয়!
বাস্তব কদম আলী: সত্যি বলছ? এই নিয়মটা আমাদের দেশে আনো না ভাই! আমাদের দেশে যদি পরকীয়া আর অবৈধ সম্পদওয়ালাদের ধরে তাদের ফ্ল্যাটগুলো আমার মতো সৎ ট্যাক্সপেয়ারদের ফ্রিতে দিয়া দেওয়া হইতো, তবে আমি কালকেই খুশিমনে আরও ১০% ট্যাক্স বেশি দিতাম!
এলিয়েন কদম আলী: হা হা হা! কদম ভাই, এই বুদ্ধি যদি এনবিআর (NBR) পায়, তবে তারা পরকীয়ার ওপরও ‘লাক্সারি ট্যাক্স’ বসায় দিবো! তখন দেখা যাবে পরকীয়া করতেও লাইসেন্স লাগতাছে!
**বাস্তব কদম আলী: তা যা বলছ। এ দেশে ট্যাক্স বসানোর লোকের অভাব নাই, কিন্তু সুবিধা দেওয়ার লোকের বড় অভাব।
এলিয়েন কদম আলী: চলি কদম ভাই, রাত অনেক হইলো। তোমার এই দুঃখের আলাপ শুনলে আমার এন্টেনাও জ্যাম হয়া যায়। চিন্তা কম করো, দেখি উপর মহলে কথা বইলা তোমার এই ৫টা ফ্ল্যাটের ট্যাক্স মওকুফের কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না!
বাস্তব কদম আলী: আচ্ছা যাও ভাই, সাবধানে যাইও। রাস্তায় আবার ট্রাফিক পুলিশের জ্যামে পইড়ো না!
এলিয়েন কদম আলী ইউএফও-তে উঠে স্টার্ট দিল নীল আলো জ্বালিয়ে স্পেসশিপটি যখন আকাশে মিলিয়ে গেল, বাস্তব কদম আলী একটা স্বস্তির হাসি হেসে ভাবলেন—সুবিধা না পাইলেও, মনের ক্ষোভটা ঝেড়ে অন্তত আজ রাতে একটু শান্তিতে ঘুমানো যাবে।