বাস্তব কদম আলী (দীর্ঘশ্বাস ফেলে): তাকাও এই শহরের দিকে। আমরা ১৯৯১ সালে যখন ছাত্র ছিলাম, এই শহরটাকে অন্যভাবে দেখতাম। আমাদের কাছে শহরটা ছিল স্বপ্নের মানচিত্র। আর তোমরা? তোমরা এই শহরটাকে দেখছ একটা বাজার হিসেবে, যেখানে সবকিছু বিক্রি হয়—আদর্শ, ভাষা, এমনকি বিবেকও। কেন তোমরা এত নিষ্ঠুর হয়ে গেলে?
এলিয়েন কদম আলী: নিষ্ঠুরতা? না চাচা, এটা নিষ্ঠুরতা নয়। এটাকে বলে ‘অ্যাডাপ্টেশন’ বা মানিয়ে নেওয়া। আপনি যে আদর্শের কথা বলছেন, সেটা ১৯৯১ সালে হয়তো চলেছিল, কিন্তু ২০২৬ সালে সেই আদর্শ দিয়ে পেট ভরে না। আপনারা যখন লড়েছিলেন, তখন আপনাদের পেছনে পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডের একটা শক্ত ভিত্তি ছিল। আমাদের অনেককে দেখুন—আমরা এসেছি একদম নিচু পরিবার থেকে। আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাটাই ছিল আসল যুদ্ধ। আপনি যখন অভাবের আগুনে পুড়ে বড় হন, তখন আপনি বিনয় শিখতে পারেন না, আপনি শিখেন কীভাবে ছিনিয়ে নিতে হয়।
বাস্তব কদম আলী: অভাব তো আমাদেরও ছিল। আমরা কি তখন খারাপ হয়ে গিয়েছিলাম? আমরা গালি দিয়ে কথা বলিনি, আমরা অর্থলোভী হইনি। আমরা বুঝেছিলাম, সমাজের একটা কাঠামো আছে। তোমরা তো সেই কাঠামোটাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছ। তোমাদের ভাষার এই অসংযম—এটা কি তোমাদের অভাবের বহিঃপ্রকাশ, নাকি রুচির অভাব?
এলিয়েন কদম আলী: আপনি বলছেন ভাষার কথা, আমি বলছি ‘ইমপ্যাক্ট’-এর কথা। আপনারা সুন্দর করে গুছিয়ে বলতেন, কিন্তু আপনাদের কথা কি তখন সিস্টেম শুনেছিল? কতটুকু শুনেছিল? আমরা শিখেছি, এই ডিজিটাল যুগে আপনি যদি শান্তশিষ্টভাবে কথা বলেন, কেউ আপনাকে পাত্তাও দেবে না। আমাদের ভাষায় যদি একটু ঝাঁঝ না থাকে, যদি একটু কর্কশ না হয়, তবে আমাদের কথাগুলো ‘অ্যালগরিদম’-এর ভিড়ে হারিয়ে যায়। আমরা চিৎকার করছি, কারণ এতদিন আমাদের কেউ শোনেনি। আর অর্থের নেশা? এটা তো আপনারা শিখিয়েছেন। পুরো সমাজটাকে আপনারা বানিয়ে রেখেছেন টাকা উপার্জনের একটা যন্ত্র। এখন আমরা সেই যন্ত্রের সবচেয়ে দক্ষ কারিগর হতে চাইছি—তাতে দোষটা কোথায়?
বাস্তব কদম আলী: দোষ হলো ‘মানুষ’ হারিয়ে যাওয়াতে। তোমরা যখন অর্থের পেছনে দৌড়াও, তখন তোমরা ভুলে যাও যে জীবনের একটা বড় অংশই হলো ‘সম্পর্ক’। তোমরা কি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দাও? তোমরা কি কোনো বিকেলে কোনো বই পড়ো? না, তোমরা শুধু দেখছ কীভাবে দ্রুত বড়লোক হওয়া যায়। তোমরা যখন বড়লোক হবে, দেখবে তোমাদের চারপাশে মানুষ আছে ঠিকই, কিন্তু কোনো ‘মানুষ’ নেই। তোমরা কি জানো, ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানোর চেয়েও কঠিন হলো—সেই জায়গা থেকে মানুষ হিসেবে নিচে নামা?
এলিয়েন কদম আলী: আপনি খুব সুন্দর কথা বলছেন। কিন্তু চাচা, আয়নায় নিজের চেহারাটা একটু ভালো করে দেখবেন? আপনারা যারা আমাদের সিনিয়র, যারা আমাদের মেন্টর হওয়ার কথা ছিল—আপনারা নিজেরা কি সততার সাথে দেশটা চালিয়েছেন? আপনারাই তো আমাদের শিখিয়েছেন যে, সততার চেয়ে চাতুর্য বেশি দামি। আজ যখন আমরা সেই চাতুর্য প্রয়োগ করছি, তখন আপনারা আমাদের ‘নষ্ট’ বলছেন। আমরা নষ্ট নই, আমরা আপনাদেরই ‘রিফ্লেকশন’। আপনারা যেটা করতে চেয়েও পারেননি বা করতে সাহস করেননি, আমরা সেটা নির্দ্বিধায় করছি।
বাস্তব কদম আলী: তুমি ঠিকই বলেছ। আমাদের ব্যর্থতা আছে। আমরা হয়তো এমন কোনো সিস্টেম গড়ে তুলতে পারিনি যেখানে সততা পুরস্কার পায়। আমরা হয়তো তোমাদের সামনে যোগ্য উদাহরণ হতে পারিনি। কিন্তু তাই বলে কি তোমরা ধ্বংসের পথে হাঁটবে? এই যে তোমরা আন্দোলনের নামে যা করছ, তাতে কি কোনোদিন একটা উন্নত সমাজ গঠিত হবে? ঘৃণা দিয়ে কি কখনো ভালোবাসা তৈরি করা যায়?এলিয়েন কদম আলী: ভালোবাসা এখন বিলাসিতা, চাচা। আমরা এখন ‘সারভাইভাল মোড’-এ আছি। দেখুন, যে ছেলেটি বা মেয়েটি কুঁড়েঘর থেকে উঠে এসে আজ জাতীয় পর্যায়ে কথা বলছে, সে কি আর আগের জায়গায় ফিরে যেতে চায়? সে জানে, একবার যদি হাতছাড়া হয়, তবে সে আবার সেই গর্তেই ফিরে যাবে। এই ভয়টাই তাকে ‘অর্থলোভী’ আর ‘আগ্রাসী’ বানিয়ে তুলছে। আমরা নষ্ট প্রজন্ম নই, আমরা হলাম—ভয়ে থাকা প্রজন্ম’। আমাদের ভয় দেখিয়েছে আমাদের অতীত, আর আমাদের লোভ দেখাচ্ছে বর্তমান।
বাস্তব কদম আলী: তাহলে কি কোনো উপায় নেই? আমরা কি এভাবেই আমাদের উত্তরসূরিদের হারিয়ে ফেলব? আমার মনে হয়, আমাদের দোষটা আরও গভীর। আমরা তোমাদের শুধু ‘কী করতে হবে’ সেটা শিখিয়েছি, কিন্তু ‘কেন বাঁচতে হবে’—সেই দার্শনিক শিক্ষাটা দিতে ভুলে গেছি। তোমরা প্রযুক্তির নেশায় মত্ত, কিন্তু আত্মার তৃষ্ণা তোমাদের মেটানোর কেউ নেই।
এলিয়েন কদম আলী: আপনি কি মনে করেন আমাদের আত্মার তৃষ্ণা মেটানো সম্ভব? আমরা তো সারাদিন ডেটা আর তথ্যের সাগরে ডুবে থাকি। আমাদের সাথে কথা বলার মতো সময় কি কারো আছে? আপনারা ব্যস্ত আপনাদের ক্যারিয়ার নিয়ে, আমরা ব্যস্ত আমাদের টিকে থাকার লড়াই নিয়ে। মাঝখানে একটা দেয়াল তৈরি হয়ে গেছে। সেই দেয়ালে আপনারা লিখেছেন ‘আদর্শ’, আর আমরা লিখেছি ‘বাস্তবতা’।
বাস্তব কদম আলী: শোনো, আমি তোমাকে ঘৃণা করি না। আমি বরং তোমাদের করুণা করি। কারণ, তোমরা অনেক বড় একটা পৃথিবী পাচ্ছ, কিন্তু সেই পৃথিবীটাকে দেখার জন্য যে চোখ দরকার—সেই বিবেকটা তোমরা হারিয়ে ফেলছ। আমি চাই, তোমরা শুধু সফল না হও, তোমরা মানুষ হও। যদি পারো, নিজের ভেতরের এই যন্ত্রটাকে একটু থামাও। একদিন আকাশটার দিকে তাকাও। ভাবো, টাকা ছাড়াও পৃথিবীতে কিছু সুন্দর জিনিস আছে।
এলিয়েন কদম আলী: একদিন চেষ্টা করব। হয়তো যেদিন আপনাদের মতো আমাদের চুলও পেকে যাবে, সেদিন বুঝব—টাকা দিয়ে সব কেনা যায় না। কিন্তু চাচা, আজকের এই লড়াইটা কি আমরা থামিয়ে দিতে পারি? যদি আমরা না লড়ি, তবে কি আপনারা আমাদের জায়গাটা বদলে দেবেন? না, দেবেন না। তাই আমাদের লড়তে হচ্ছে। লড়তে লড়তে আমরা যদি একটু বেশি কর্কশ হয়ে যাই, তবে একটু ক্ষমা করবেন। আমরা তো মানুষই হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু জগতটা আমাদের জানোয়ার হতে বাধ্য করল।
বাস্তব কদম আলী: জানোয়ার হতে বাধ্য করলে, মানুষের ধর্ম হলো নিজের মনুষ্যত্বকে আঁকড়ে ধরে রাখা। তোমরা যদি নিজের মনুষ্যত্বটুকু হারিয়ে ফেলো, তবে তোমরা আর এই পৃথিবীর অংশ থাকবে না। আমি তোমাদের মেন্টর হতে রাজি আছি। যদি তোমরা নিজের ভুলগুলো স্বীকার করার মতো সাহস দেখাতে পারো, তবেই আমি তোমাদের সাথে কাজ করব। কারণ, দেশটা কেবল আমার নয়, দেশটা তোমাদেরও।
এলিয়েন কদম আলী: যদি আপনি সত্যিই আমাদের ‘মানুষ’ হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি থাকেন, তবে আমি রাজি। কিন্তু শর্ত একটাই—আমাদের বাস্তবতাকে অস্বীকার করবেন না। আমরা যা, তা মেনেই আমাদের বদলানোর চেষ্টা করুন।
বাস্তব কদম আলী : ঠিক আছে। আজ থেকে তাহলে শুরু হোক—অভিজ্ঞতার সাথে শক্তির মিলন। দেখি, আমরা দুজন মিলে এই মিরপুরের আকাশ থেকে ধোঁয়া সরিয়ে কিছুটা নীল আকাশ খুঁজে পাই কি না।
(ছাদের ওপর তখন জোনাকি উড়ছে। ডিজিটাল যুগের অস্থিরতা আর অভিজ্ঞতার স্থিরতা—দুই বিপরীত মেরুর দুই কদম আলী মিলে দাঁড়িয়ে আছেন অন্ধকারের মধ্যে, যেন এক নতুন ভোরের অপেক্ষায়।)