নিজস্ব প্রতিবেদক | বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ না দেওয়ার যে আশ্বাস দিয়েছেন, তা শুনতে আশাব্যঞ্জক হলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে রাজস্ব বাড়ানোর নানা গাইডলাইন বা পরিকল্পনার কথা বলা হলেও, কার্যকর ফ্রেমওয়ার্কের অভাবে সেগুলো শেষ পর্যন্ত 'কাগজেই বাষ্পীভূত' হয়ে যাচ্ছে।
কেন পরিকল্পনাগুলো 'উড়ে' যায়?
১. *ব্যক্তি-নির্ভর ব্যবস্থা (Person-Dependent System):
সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বললেও রাজস্ব প্রশাসন এখনো অনেকাংশে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। আপনি যে *"System Trust"*-এর কথা বলেন, তার অনুপস্থিতিতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা তাদের নিজস্ব ক্ষমতাবলে কর নির্ধারণ করেন। ফলে নীতিনির্ধারকদের 'চাপ না দেওয়ার' নির্দেশ ফাইলবন্দি হয়ে থাকে, আর মাঠপর্যায়ে করদাতাদের নাজেহাল হতে হয়।
২. ফ্রেমওয়ার্ক বিহীন লক্ষ্যমাত্রা:
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় অনেকটা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে। নতুন করদাতা খুঁজে বের করার কোনো কার্যকর 'ডেটা-লুপ' বা অটোমেটেড ফ্রেমওয়ার্ক নেই। যখনই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে টান পড়ে, তখনই এনবিআর ঘুরেফিরে সেই পুরোনো ও নিয়মিত করদাতাদের ওপরই খড়গহস্ত হয়।
৩. সমন্বয়ের চরম অভাব:
বিআরটিএ, ব্যাংক, বা ভূমি অফিসের তথ্য যদি এনবিআরের সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিনিময় হতো, তবে করের আওতা বাড়ানো কোনো কঠিন কাজ ছিল না। কিন্তু আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়হীনতার কারণে এই ডেটাবেজ এখনো একটি 'মিথ' বা অলীক কল্পনা হয়েই আছে।
৪. সংস্কারের সদিচ্ছার অভাব:
পদ্ধতিগত সংস্কার হলে অস্বচ্ছ উপায়ে লেনদেনের সুযোগ কমে যাবে। এই ভয়ে একটি বিশেষ মহল কখনোই একটি আধুনিক ও স্বচ্ছ 'ট্যাক্স ফ্রেমওয়ার্ক' দাঁড় হতে দিচ্ছে না।
সাধারণ করদাতার উদ্বেগ
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী যখন বলেন "চাপ বাড়ানো হবে না", তখন সাধারণ ব্যবসায়ীদের মনে প্রশ্ন জাগে—তবে কি করের পরিধি বাড়ানো হবে নাকি কেবল কথার ফুলঝুরিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে? কারণ, যথাযথ রোডম্যাপ ছাড়া এমন আশ্বাস কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবেই ইতিহাসে জায়গা পায়।
পরিকল্পনা যখন গাণিতিক ফ্রেমওয়ার্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না, তখন তা কল্পনায় রূপ নেয়। বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান সংকটে প্রয়োজন একটি *'সিস্টেম-চালিত'* রাজস্ব ব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো স্থান থাকবে না। নতুবা "পড়ি উড়ে যায় থাকে কল্পনা"—এই আক্ষেপ থেকে করদাতারা কখনোই মুক্তি পাবেন না।