বাস্তব কদম আলী:ছেঁড়া স্যান্ডেল, কপালে চিন্তার ভাঁজ। পেশায় ভ্যাট-প্রপীড়িত খাঁটি দেশি ভোক্তা।
এলিয়েন কদম আলী: দেখতে হুবহু বাস্তব কদম আলীর মতোই, তবে তার গায়ের চামড়া ঈষৎ সবুজ, মাথায় দুটো ফাইবার-অপটিক অ্যান্টেন। সে এসেছে ছায়াপথের ওরিয়ন বেল্ট থেকে।
বাস্তব কদম আলী একটা বিড়িতে টান দিতেই পাশ থেকে এলিয়েন কদম আলী কাশির শব্দ করল—'খক খক'
বাস্তব কদম: আরে ওরে বাবারে! ভূত নাকি রে? চেহারা তো দেহি আমার মতোই! আইনা থেইকা বাইর হইয়া আইলা নাকি?
এলিয়েন কদম: শান্ত হও, হে পার্থিব ডিএনএ-র জমজ। আমি ভূত নই। আমি ‘ইউ-২৩৮’ গ্যালাক্সির কদম আলী। সংক্ষেপে এলিয়েন কদম। মহাবিশ্বের ট্যাক্স-ব্ল্যাকহোল খুঁজতে খুঁজতে তোমার এই বুড়িগঙ্গার পাড়ে ল্যান্ড করেছি।
বাস্তব কদম:ওমা! তা মহাবিশ্ব থুইয়া আমার কাছে ক্যা? বউয়ের বাজারের ফর্দ আর ভ্যাটের চোটে আমার নিজেরই এলিয়েন হওয়ার দশা! আর তোমারে কি আমি চিনি না, একটু ভয় পাওয়ার ভাব লইলাম।
এলিয়েন কদম:আসলে কদম, আমি তোমার এই গ্রহের ফিসকাল পলিসি বুঝতে এসে নিজেই একটা গভীর পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়েছি। আই অ্যাম ইন লাভ উইথ সামথিং বিউটিফুল!
বাস্তব কদম: কও কী মিয়া! এলিয়েন হইয়াও পরকীয়া? তা কার লগে লাইন মারছ? পাশের বাড়ির মতির মা, নাকি আমাগো দেশের কোনো পরীবানু?
এলিয়েন কদম: না কদম। আমার প্রেম কোনো রক্ত-মাংসের মানবী নয়। আমার পরকীয়া চলছে তোমাদের দেশের ‘ডলার রেট’ আর ‘এনবিআর’-এর রোমান্টিক ত্রিভুজ প্রেমের সাথে! আহা, কী তাদের লীলাখেলা!
বাস্তব কদম: ধুর মিয়া, পরকীয়া কইলা, আবার ডলার আর ভ্যাট টানলা! এইডাতে পরকীয়া কই পাইল্লা?
এলিয়েন কদম: বুঝলে না? শোনো, ভ্যাট’ বিবাহিত স্ত্রীর মতো। সে শান্তশিষ্ট, নির্দিষ্ট একটা হারে (যেমন ১৫%) ঘরে বসে থাকে। কিন্তু এই সংসারে হঠাৎ আগমন ঘটল এক মোহময়ী পরকীয়া প্রেমিকার—যার নাম ‘ডলারের মূল্যবৃদ্ধি’! সে উথাল-পাথাল সুড়সুড়ি দিয়ে ভ্যাটের ‘ভিত্তিমূল্য’ বা টেক্সাবল বেস-কে দ্বিগুণ করে দেয়। স্ত্রী (ভ্যাট) ঘরে বসেই মোটা হয়ে যাচ্ছে এই পরকীয়ার পরশে!
বাস্তব কদম:ওরে আমার এলিয়েন ভাই রে! তুমি তো জেনুইন কথা কইছ! ডলারের লগে পরকীয়া কইরা ভ্যাটের ভুঁড়ি তো দিন দিন বাড়তাছে, কিন্তু মরতাছি তো আমি! দোকানে গেলেই দোকানদার কয়, "কদম ভাই, ডলারের দাম বাড়ছে, তাই ভ্যাটও বাড়ছে।"
এলিয়েন কদম: ভুল! এখানেই তো পরকীয়ার টুইস্ট! তোমার দোকানদার আসলে পরকীয়ার আসল মজাটা লুটে নিচ্ছে। আইনি মতে, ভ্যাটের হার কিন্তু বাড়েনি। ১৫% এর ওপরে অন্য কোনো পার্সেন্টেজের সাথে ভ্যাটের বিয়ে হয়নি। কিন্তু ডলার সুন্দরী যখনই নাচানাচি করে, আমদানির অ্যাসেসড ভ্যালু ১০০ টাকা থেকে ১২০ টাকা হয়ে যায়। আর অমনি ওই ১৫% সুন্দরী ভ্যাট ১২০ টাকার ওপর বসে বেশি বেশি টাকার বাচ্ছা জন্ম দেয়! এটা হলো ফিসকাল পরকীয়া!
বাস্তব কদম: তা এলিয়েন ভাই, এই পরকীয়ায় যদি এতই টাকার বাচ্ছা হয়, তবে আমাগো সরকারের কোষাগার খালি থাকে ক্যা? লক্ষ্যমাত্রা থেইকা পিছাইয়া পড়ে ক্যা?
এলিয়েন কদম:ওই যে বললাম, পরকীয়া প্রেমের পরিণতি সবসময় ট্র্যাজিক হয়। যখন ডলার সুন্দরীর পেছনে এনবিআর বেশি দিওয়ানা হয়ে যায়, তখন আসল স্ত্রী অর্থাৎ ‘লোকাল কনজাম্পশন’ বা দেশের সাধারণ মানুষ রেগেমেগে সংসার করা ছেড়ে দেয়। তুমি যেমন বেশি দাম দেখে সাবান কেনা অর্ধেক করে দিয়েছ, তেল কেনা কমিয়ে দিয়েছ।
বাস্তব কদম:হ ভাই, ঠিকই কইছ। বউ কালকে কইছে, তরকারিতে তেল আর দেওয়া যাইব না, শুধু সিদ্ধ খাইবা।
এলিয়েন কদম:ব্যস! তুমি তেল কেনা কমিয়ে দিলে, মানে তুমি কনজাম্পশন করলে না। আর ভ্যাটের মূল মন্ত্রই হলো—‘ভোগ করেন যিনি, ভ্যাট দেন তিনি’। তুমি ভোগই করলে না, তো ভ্যাট আসবে কোত্থেকে? ফলে ডলারের সাথে পরকীয়া করে আমদানি পর্যায়ে সাময়িক কিছু সুখ মিললেও, বছর শেষে আসল সংসার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা লাটে ওঠে!
বাস্তব কদম: আহারে! তা তোমার ওই ওরিয়ন বেল্টে কি এইরকম পরকীয়া নাই? তোমরা ভ্যাট দাও কেমনে?
এলিয়েন কদম: আমাদের ওখানে কোনো মানুষ ভ্যাট কাটে না কদম। কোনো পেপারওয়ার্ক নেই, কোনো উকিল-আইনজীবী বা ম্যানুয়াল ফাইলিং নেই। আমাদের আছে ‘সিস্টেম ট্রাস্ট’। আমরা যখন স্পেস-শিপে ফুয়েল ভরি, পুরো ট্যাক্সটা ডিজিটাল কমপ্লায়েন্সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে যায়। কোনো ডলারের পরকীয়া আমাদের সিস্টেমে নাক গলাতে পারে না।
বাস্তব কদম: আমাদের দেশেও যদি এই ‘সিস্টেম ট্রাস্ট’ থাকত ভাই! ইএফডি মেশিনগুলা যদি ঠিকঠাক কাজ করত, আর ডলারের এই পরকীয়া প্রেমের খেসারত যদি আমাগো সাধারণ কদম আলীদের দেওয়া না লাগত!
এলিয়েন কদম:চিন্তা করো না জমজ ভাই। একদিন তোমার দেশেও রোবোটিক অটোমেশন আসবে। মানুষ যখন ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া আর ডলারের অবৈধ প্রেম ভুলে সিস্টেমে ভরসা করবে, সেদিন তুমিও শান্তিতে দুমুঠো ভাত খেতে পারবে। চলি ভাই, আমার স্পেস-শিপের পার্কিং চার্জ আবার ভ্যাটসহ বাড়ছে!
এলিয়েন কদম আলী তার অ্যান্টেনায় নীল আলো জ্বেলে শূন্যে মিলিয়ে গেল। বাস্তব কদম আলী পকেটে হাত দিয়ে দেখল, শেষ বিড়িটাও উধাও। সে মনে মনে ভাবল, নির্ঘাত এলিয়েনটা পরকীয়া করে বিড়িটাও ভ্যাট হিসেবে নিয়ে গেছে!