বাস্তব কদম আলী এবং এলিয়েন কদম আলী বুড়িগঙ্গার তীরে একটা চায়ের দোকানে বসে আছে। বাস্তব কদম আলীর মন ভালো নেই। তার মন জুড়ে এখন দুটো পরকীয়া—একটি হলো সিস্টেমের সাথে তার চিরন্তন "অবৈধ" প্রেম, অন্যটি তার পরকীয়া প্রেমিকা মজনু মিয়ার বউ ছকিনা।
কিন্তু আজ ছকিনাকে নিয়ে ভাবার সময় নেই। এনবিআর কোনো সেক্টর-ভিত্তিক ফ্রেমওয়ার্ক ছাড়াই ভ্যাটের পরিধি বাড়ানোর নোটিশ পাঠিয়েছে। এটা নিয়েই শুরু হলো দুই কদম আলীর মহাজাগতিক ও রোমান্টিক কথোপকথন।
বাস্তব কদম আলী: বুঝলি এলিয়েন ভাই, আমার মনটা আজ ওই ছকিনার আঁচলের মতো উড়ুউড়ু করছে না। মনের ভেতর একটা তীব্র পরকীয়া জ্বলছে—ভ্যাট ফাঁকির সাথে আমাদের যে আদিম গোপন প্রেম, সেটা আজ হুমকির মুখে!
এলিয়েন কদম আলী:কেন হে বাস্তব কদম? তোমাদের গ্রহের বসরা নাকি সেক্টর-ভিত্তিক ভ্যাট ওয়ার্ক ফ্রেম (Sector-specific VAT framework) ছাড়াই ডালাওভাবে করের পরিধি বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে? এটা তো বৈজ্ঞানিক আত্মহত্যা! আমাদের গ্রহে এমন করলে বসকে ব্ল্যাকহোলে ছুড়ে ফেলা হতো।
বাস্তব কদম আলী: আরে ধুর, তোরা তো রোবট, প্রেমের কি বুঝিস? পরিকল্পনা ছাড়া পরিধি বাড়ানো মানেই তো আমাদের মতো মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পৌষ মাস! দাপট কাকে বলে দেখবি এবার। সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, ওষুধের দোকান, আর কাপড়ের শোরুম—সবাইকে এক লাঠিতে তাড়াব। কোনো খাতের ইনপুট-আউটপুট রেশিও (Input-Output Ratio) দেখব না। খালি নোটিশ পাঠাব আর বলব, "নথিপত্র নিয়ে ভ্যাট অফিসে দেখা করুন, নইলে লকডাউন!"
এলিয়েন কদম আলী: কিন্তু কদম, এটা তো চরম হয়রানি (Harassment)। ভ্যাট তো একটি কনজাম্পশন ট্যাক্স (Consumption Tax)। কাঁচামাল থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সাপ্লাই চেইন ম্যাপিং (End-to-End Supply Chain Mapping) না করে যদি তোমরা ব্যবসায়ীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ো, তবে অর্থনীতি তো পঙ্গু হয়ে যাবে। ব্যবসায়ীরা কর নেট থেকে পালাবে। যেমনটা তোমার প্রেমিকা ছকিনা তার আসল জামাই মজনুর কাছ থেকে পালায়!
বাস্তব কদম আলী: ছকিনার কথা তুলিস না ভাই, ওটা আমার পবিত্র পরকীয়া! কিন্তু এই ভ্যাট ব্যবস্থার সাথে আমাদের যে সম্পর্ক, সেটাও এক ধরণের পরকীয়া। আইন এক কথা বলে, আমরা ব্যাকডোরে গিয়ে অন্য হিসাব করি। যদি সিমেন্ট বা এফএমসিজি (FMCG) খাতের নিজস্ব চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে কাস্টমাইজড কমপ্লায়েন্স গাইডলাইন থাকত, তবে ডাটা স্পষ্ট থাকত। তখন আমরা ব্যবসায়ীদের ভয় দেখাতে পারতাম না, মনগড়া অডিট ফাইন্ডিংস দিতে পারতাম না। আমাদের দাপট কমে যেত!
এলিয়েন কদম আলী: তোমরা মানুষরা অদ্ভুত! স্বয়ংক্রিয় ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট (Input Tax Credit) বা সহজ রেয়াত ব্যবস্থা থাকলে ব্যবসায়ীরা নিজেরাই চেইনে যুক্ত হতো। ব্যবস্থাটাই তাদের বাধ্য করত (Self-Enforcing Nature of VAT)। কিন্তু তোমরা সেটা করছ না যাতে তোমাদের "দাপট" আর "গোপন পরকীয়া" বজায় থাকে। ডিস্ট্রিবিউশন হাবগুলোকে ডিজিটাল পেমেন্টে লিংক-আপ না করে তোমরা ছোট দোকানদারদের খাতা-কলম নিয়ে তাড়া করছ। এটা তো আদিম বর্বরতা!
বাস্তব কদম আলী: তুই ঠিকই ধরেছিস এলিয়েন ভাই। এই বিশৃঙ্খলাটাই আমাদের ক্ষমতার উৎস। আমাদের বসরা যখন কোনো সুনির্দিষ্ট খাত-ভিত্তিক গাইডলাইন ছাড়া শুধু 'রাজস্ব বাড়াও' বলে হুকুম দেয়, তখন মাঠপর্যায়ে আমরা হয়ে উঠি একেকজন জমিদার। ব্যবসায়ী এসে হাতজোড় করে কাঁদবে, আর আমরা বলব, "উপরি না দিলে মামলা।" এই যে ব্যবসায়ীর কান্না আর আমাদের ক্ষমতার দাপট—এটাই তো এই সিস্টেমের আসল সৌন্দর্য!
এলিয়েন কদম আলী: আমি আমার ডাটাবেজে নোট নিচ্ছি—"পৃথিবীর ভ্যাট ব্যবস্থা হলো একটি অমীমাংসিত পরকীয়া প্রেম, যেখানে বিজ্ঞানকে দূরে ঠেলে হয়রানিকে আলিঙ্গন করা হয়।" কদম, যদি তোমরা পুরো সাপ্লাই চেইনকে একটা সুতোয় না গাঁথো, তবে এই কর নেট সম্প্রসারণের বেলুন একদিন ফেটে যাবে।
বাস্তব কদম আলী: ফাটুক ভাই, যেদিন ফাটবে সেদিন দেখা যাবে। আপাতত ছকিনা টেক্সট পাঠিয়েছে, মজনু মিয়া নাকি দোকানে গেছে। আমি এখন আমার আসল পরকীয়ায় মনোযোগ দিই। আর ভ্যাটের পরকীয়া? ওটা তো এনবিআরের ডিজিটাল সিস্টেম পুরোপুরি না আসা পর্যন্ত আমাদের পকেটেই থাকবে!
(এলিয়েন কদম আলী তার স্পেসশিপের রিমোট চাপল, আর বাস্তব কদম আলী লুঙ্গিটা একটু কষে বেঁধে ছকিনার গলির দিকে রওনা দিল।)