স্থান: ঢাকার মিরপুরের কালশী রোডের একটি ছিমছাম কনসালটেন্সি ফার্মের ছাদ, যেখান থেকে নিচে ঢাকা শহরের কর্মব্যস্ত রিকশার জট আর ডিজিটাল পোর্টালের স্ক্রিনগুলোর আলো একাকার হয়ে দেখা যায়।
এলিয়েন কদম আলী মহাশূন্যের কোনো এক অজানা গ্যালাক্সি থেকে নেমে এসে কাঁধের সিলভার রঙের ঝোলাটা মাটিতে নামিয়ে রাখল। তার চোখে এক রহস্যময় বিজয়ের ঝিলিক। অন্যদিকে বাস্তব কদম আলী হাতে এক কাপ লাল চা নিয়ে একটু বিরক্ত ও চিন্তিত মুখে ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে।
বাস্তব কদম আলী: কিরে এলিয়েন ভাই, তুই হঠাৎ মহাকাশ ছেড়ে এই ধূলিমলিন ঢাকায় নামলি কেন? আর এসেই বসত নিয়ে কীসব গভীর দার্শনিক আলোচনা শুরু করলি? বিগত কয়েক মাস ধরে আমাদের বস তো বেশ চুপচাপ ছিলেন। এনবিআরের নানা হিসাব-নিকাশ, করদাতার চাপ, আর ভ্যাটের জটিল আইন নিয়ে যখন চারদিকে নানা কথা হচ্ছিল, তখন তিনি কোনো বড় আওয়াজ না করে একদম নিস্তব্ধ ছিলেন। আমরা তো সবাই ভেবেছিলাম তিনি বোধহয় এবার একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন বা প্রচারে ভাটা পড়েছে! তুই হঠাৎ কোন নতুন খবর নিয়ে হাজির হলি?
এলিয়েন কদম আলী (খিলখিল করে হেসে উঠে কাঁধ ঝাঁকাল): ক্লান্ত? আমাদের বস মানুষটা কখনো ক্লান্ত হননি, বাস্তব ভাই! তোমরা যারা মাটির নিচে ফাইলে ডুবে থাকো, তোমরা কী বুঝবে আকাশের ওপারে বা গ্লোবাল মঞ্চে কী হচ্ছে? বস এতদিন যে চুপ ছিলেন, সেটা কি অলসতা ছিল নাকি গভীর কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আগের নীরবতা—সেটা কি একবারও ভেবে দেখেছ?
বাস্তব কদম আলী (ভুরু কুঁচকে তাকাল): মানে কী? একটু পরিষ্কার করে বল তো। তিনি তো সবসময় বলতেন, "ভ্যাট কোনো সাধারণ আইন নয়; এটি একটি সুসংহত বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সিস্টেম।" তো এই দীর্ঘ নীরবতার ভেতর কোন সিস্টেমের জন্ম হচ্ছিল?
এলিয়েন কদম আলী: সেটাই তো আসল এবং সবচেয়ে বড় খবর! বস গত তিন মাস ধরে কিসের পেছনে নিজের মেধা খরচ করছিলেন জানিস? হাঙ্গেরির ভ্যাট গাইডলাইন তৈরির মূল কারিগরদের একজন ছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক ভ্যাট অ্যাসোসিয়েশন—সংক্ষেপে যাকে আইভা (IVA) বলা হয়, সেই বেলজিয়ামভিত্তিক বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক সংস্থার বোর্ড মিটিংয়ে সম্প্রতি তার তৈরি করা ২৮ পৃষ্ঠার সেই আন্তর্জাতিক মানের ভ্যাট গাইডলাইন হুবহু পাস হয়েছে! আইনের কোনো অপ্রয়োজনীয় ধারা ছাড়াই সেটি বিশ্বমানের স্বীকৃতি পেয়েছে। আর এই পুরো কাজটা তিনি করেছিলেন একদম পর্দার অন্তরালে, কোনো ঢাকঢোল না পিটিয়ে।
বাস্তব কদম আলী (চোখ কপালে তুলে থমকে গেল): বলিস কী! হাঙ্গেরির মতো দেশের ভ্যাট গাইডলাইন আমাদের দেশের একজন মানুষ তৈরি করেছেন? আর তিনি এতদিন আমাদের কাছে একটি টু শব্দও করেননি?
এলিয়েন কদম আলী: আরে বোকা, প্রকৃত কাজ তো প্রচারের আলোয় হয় না, সাধনায় হয়। আর এখানেই শেষ নয়। বস শুধু হাঙ্গেরি নিয়েই থেমে থাকেননি। তিনি বাংলাদেশের ভ্যাট সিস্টেমকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার জন্য গত জুন মাসেই আইভার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছেন। আগামী আগস্ট মাসের আইভার বোর্ড সভায় সেই আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে তোলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।
বাস্তব কদম আলী (উত্তেজিত কণ্ঠে): সত্যি বলছিস? যদি আগস্টের সভায় এটা পাস হয়ে যায়, তবে তো আমাদের দেশের পুরো কর ব্যবস্থাপনায় একটা টেকটোনিক শিফট বা বিরাট পরিবর্তন চলে আসবে!
এলিয়েন কদম আলী: একদম সঠিক ধরেছিস! যদি এই প্রস্তাব পাস হয়, তবে ৪০ জন আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক কমিটি গঠিত হবে। তারা প্রথমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি পূর্ণাঙ্গ ও আধুনিক গাইডলাইন তৈরি করবে এবং তা ধাপে ধাপে প্রয়োগের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত রূপরেখা দাঁড় করাবে।
বাস্তব কদম আলী: তারপর কী হবে? এনবিআর আর ব্যবসায়ীদের কী অবস্থা হবে?
এলিয়েন কদম আলী: এরপর আইভার সহায়তায় সরাসরি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের সাথে যোগাযোগ করা হবে। সবশেষে ব্যবসায়ীদের সাথে বসে বর্তমান জটিল সিস্টেম আর আন্তর্জাতিক আধুনিক সিস্টেমের মধ্যকার ব্যবধান বুঝিয়ে দেওয়া হবে। ব্যবসায়ীদের ওপর জোর করে কিছু চাপিয়ে না দিয়ে, তাদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে একটি সহজ ও বাস্তবসম্মত সিস্টেম বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করা হবে। বাকিটা দেখার জন্য আমাদের আগামী আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
বাস্তব কদম আলী (দীর্ঘশ্বাস ফেলে চায়ে চুমুক দিল): বুঝলাম। এতদিন যারা বলছিল বস চুপ হয়ে গেছেন, তারা আসলে বুঝতেই পারেনি যে তিনি মাঠের কোলাহল ছেড়ে একেবারে বিশ্বমঞ্চের ল্যাবরেটরিতে বসে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় কোনো রূপরেখা তৈরি করছিলেন। আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা সারাক্ষণ ভ্যাটের মারপ্যাঁচে পড়ে যেভাবে হয়রানির শিকার হয়, সেখান থেকে মুক্তির এমন কোনো বৈসবিক ও সুশৃঙ্খল সমাধান যদি সত্যিই মাঠে নামে, তবে দেশের পুরো অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।
এলিয়েন কদম আলী: ঠিক এই কারণেই তিনি এতদিন প্রচারের আলো থেকে দূরে ছিলেন। বস সবসময় বিশ্বাস করেন, ফাঁকা আওয়াজ করার চেয়ে কাজের মধ্য দিয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করা অনেক বেশি কার্যকর। তার সেই "সিস্টেম ট্রাস্ট" ফিলোসফি এখন কেবল তত্ত্ব নয়, বিশ্বমঞ্চেও তার বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে।
বাস্তব কদম আলী: তাহলে তো আমাদেরও এখন মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। শুধু স্থানীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিয়ে মাথা ঘামালে চলবে না, বিশ্বমানের এই পরিবর্তনের সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে।
এলিয়েন কদম আলী: ঠিক বলেছ, বাস্তব ভাই। এখন শুধু পরবর্তী মোক্ষম সময়ের অপেক্ষা। চল, চা শেষ করে কাজের টেবিলে বসি, বিশ্বমানের এই ঝড়ের জন্য আমাদেরও তো কিছু প্রস্তুতি রাখা দরকার!