করদাতাদের করভীতির চেয়ে করদানে অনীহাই বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা উচ্চবিত্তদের মাঝে দেখা যায়। তাদের (উচ্চবিত্ত) ওপর কর আরোপে সরকার সর্বদা দ্বিধাগ্রস্ত থাকে। কারণ সরকারের মধ্যে ব্যবসায়ীসহ উচ্চবিত্তদের প্রতিনিধিই বেশি।’
রাজধানীর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (এফডিসি) গতকাল ‘অর্থনৈতিক সুরক্ষায় রাজস্ব আয় বৃদ্ধির কৌশল নিয়ে প্রাক-বাজেট’ শীর্ষক ছায়া সংসদে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডিবেট ফর ডেমোক্রেসির চেয়ারম্যান হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ।
আসন্ন বাজেট প্রসঙ্গে ড. সেলিম জাহান বলেন, ‘প্রত্যেকটি বাজেটে একটি উন্নয়ন দর্শন থাকা দরকার। সেখানে দারিদ্র্য কীভাবে কমবে, কীভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে কিংবা বিশেষ কোন খাতকে সুবিধা দেয়া হবে—সেটি দৃশ্যমান করতে হবে। সর্বোপরি বাজেটের মধ্যে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন থাকতে হবে।’
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও গুণগত উন্নয়ন না হওয়ায় দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এমনিতে মূল্যস্ফীতি ও ঋণের চাপ রয়েছে। তাই অত্যন্ত জটিল সমস্যার মধ্যে এবারের বাজেট প্রণয়ন হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের প্রভাব ছাড়াও আমরা বৈদেশিক ঋণে জর্জরিত। সরকারের ব্যয়ের ২৫ শতাংশই বৈদেশিক ঋণের সুদ এবং আসল পরিশোধে ব্যয় করতে হচ্ছে। এরপর রয়েছে জ্বালানি, রফতানি ও সামাজিক সুরক্ষা খাতসহ বিভিন্ন খাতের ভর্তুকি। এতে ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, কিন্তু আয় বাড়ছে না। ফলে বাজেটে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।’
বাজেটে মানুষের প্রত্যাশার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার প্রতিফলনও থাকতে হবে বলে মনে করেন ড. সেলিম জাহান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে বড় সমস্যা মূল্যস্ফীতি। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে প্রায় সব দেশেই মূল্যস্ফীতি কমে এসেছিল; কিন্তু বাংলাদেশে এখনো বেশি। এর প্রধান কারণ কাঠামোগত দুর্বলতা, পণ্যসামগ্রীর জোগানের অভাব এবং দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনা। এবারের বাজেটে মূল্যস্ফীতির মূল সমস্যাটা খুঁজে বের করতে হবে। আসন্ন বাজেটে সেটার প্রতিফলন থাকতে হবে।’
এ সময় ব্যাংক খাতের সমালোচনা করে ড. সেলিম জাহান বলেন, ‘পৃথিবীর সব দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক ধরনের স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা ভোগ করে। কিন্তু আমাদের দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক হিসেবে। ফলে ব্যাংকগুলোর ওপর যে খবরদারি বা নজরদারি করার কথা সেটা তারা পারে না। এজন্যই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন দরকার।’
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ বলেন, ‘সংকটকালে একটি জনবান্ধব, ব্যবসাবান্ধব, টেকসই ও সাবধানী বাজেট দিতে হবে। বাজেট যাতে জনভোগান্তি না বাড়ায়, মূল্যস্ফীতি-মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি না করে, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের ওপর চাপ তৈরি না হয়, সেসব দিক বিবেচনা করে প্রণয়ন করা উচিত।’
এদিকে ছায়া সংসদে বিতর্কে সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের বিতার্কিকদের পরাজিত করে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির বিতার্কিকরা বিজয়ী হন। অনুষ্ঠানের শেষাংশে অংশগ্রহণকারী দলের হাতে ট্রফি, ক্রেস্ট ও সনদপত্র তুলে দেয়া হয়।