এক অদৃশ্য প্রোগ্রামার আমার মস্তিষ্কের ক্যাশ মেমোরিটা রিসেট করে দিয়েছে। হঠাৎ দেখি, এলিয়েন কদম আলী অফিসের সোফায় পা তুলে বসে আছে, হাতে একটা কাল্পনিক রিমোট। সে টিভির চ্যানেল ঘোরানোর মতো করে শূন্যে হাত নাড়াচ্ছে।
"কদম," সে হেসে বলল, "গত দুই দিন তো অনেক ফিলোসফি ঝাড়লে। সিস্টেম, অডিট, ভ্যালু অ্যাডিশন... মাথা গরম হয়ে গেছে। আজ এসো, একটু হালকা হওয়া যাক। এই মহাবিশ্বে শুধু অডিট আর রিটার্ন তো নয়, একটু পরকীয়া বা গসিপের ছোঁয়া না থাকলে সিস্টেমটা খুব ড্রাই লাগে।"
আমি অবাক হয়ে তাকালাম। "পরকীয়া? আমার সিস্টেমে পরকীয়া? তুমি কি সিরিয়াস?"
এলিয়েন একটা চোখ টিপে বলল, "দেখো, তোমার এই ঢাকা শহরে পরকীয়া হলো সবচেয়ে বড় 'আন-অডিটেড' বিজনেস। এটা যেন বাজারের এমন এক পণ্য, যার কোনো এইচএস কোড (HS Code) নেই, অথচ চাহিদা তুঙ্গে। তুমি সারা জীবন ভ্যাট আইন নিয়ে পড়ে আছো, কিন্তু এই সম্পর্কের ভ্যাট আইনটা কি কখনো স্টাডি করেছ?"
আমি হাসলাম। এলিয়েন যখন শুরু করে, তখন তার কাছে সব লজিকই অদ্ভুত রসালো মনে হয়। "তুমি কি বলতে চাইছ, মানুষের এই পরকীয়া আসলে এক ধরণের ট্যাক্স এভয়েডেন্স?"
"নিশ্চয়ই!" এলিয়েন উত্তেজনায় সোফা থেকে লাফিয়ে উঠল। "চিন্তা করো—একজন মানুষ তার বৈধ সম্পর্কে দিচ্ছে একরকম ট্যাক্স, আর অবৈধ সম্পর্কে দিচ্ছে পুরোপুরি ভিন্ন। প্রথমটা সরকারি, পরেরটা গোপন। দ্বিতীয়টিতে কোনো চালান নেই, কোনো ডিএস (DS) নেই। এটা তো পুরোই ক্যাশ ট্রানজ্যাকশন, বন্ধু! পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ব্ল্যাক মানি ইকোনমি হলো এই পরকীয়া।"
আমি কফির মগটা হাতে নিয়ে একটু ঝুঁকে বসলাম। "তুমি কি তাহলে পরকীয়াকে এক ধরনের 'ফিসক্যাল গ্লিচ' বলছ?"
"ঠিক তাই!" এলিয়েন এবার আমার ল্যাপটপের দিকে আঙুল তুলল। "তোমার এই অটোমেটেড সিস্টেমে যেমন কোনো মডিউল না থাকলে ডাটা লিকেজ হয়, ঠিক তেমনি মানুষের জীবনেও যখন আবেগের 'ভ্যাট' সঠিক জায়গায় পেড হয় না, তখনই মানুষ পরকীয়ায় লিক করতে শুরু করে। মনে করো, অফিসের বস তার অ্যাসিস্ট্যান্টের সাথে এমন একটা প্রজেক্ট করছে, যেটা কোম্পানির অডিটে নেই। এটাকে তুমি কী বলবে? এটা তো একটা 'শ্যাডো ইনভয়েস'!"
আমি খিলখিল করে হেসে উঠলাম। গত দুই দিনের সমস্ত ক্লান্তি এক নিমিষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। এলিয়েন সত্যিই অদ্ভুত। সে জটিল জীবনের কষ্টগুলোকে এমন এক গসিপের মোড়কে পেঁচিয়ে দেয় যে, আর কান্না পায় না, বরং হাসি পায়।
"তাহলে এলিয়েন, তোমার মতে এই অডিটেড দুনিয়ায় পরকীয়া কি বন্ধ করা সম্ভব?"
এলিয়েন একটা গম্ভীর ভঙ্গি করল, ঠিক যেন কোনো কর কমিশনার। "বন্ধ করা? কখনোই না! এটা হলো সিস্টেমের একটা 'বাগ' যা ডেভেলপার অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা ইচ্ছা করেই রেখে দিয়েছেন যাতে মানুষের জীবনটা বোরিং না হয়ে যায়। তবে শোনো, যারা এই পরকীয়ায় লিপ্ত হয়, তারা বড়ই বেকুব। তারা ভাবে তারা খুব ট্যাক্স বাঁচাচ্ছে, কিন্তু দিনশেষে যখন তাদের ইমোশনাল ব্যালেন্স শিটটা অডিট হয়, তখন দেখা যায়—সবাই দেউলিয়া!"
আমি সোফায় গা এলিয়ে দিলাম। "ঠিক ধরেছ। আমার অফিসের সামনে দিয়ে যারা যায়, তাদের অনেকের মুখেই সেই ধুলোমাখা হাসি। যারা বলে 'নীতি বুঝি না', তারা আসলে পরকীয়ার মতো জীবনের এই চোরাগলিতে হারিয়ে আছে। তাদের জীবনটা একটা 'রং এন্ট্রি' (Wrong Entry)।"
এলিয়েন আমার কাঁধে চাপড় মারল। "আজকালকার এই দুনিয়ায় টিকে থাকতে গেলে একটু পরকীয়াই সই, সেটা ভ্যাট আইনের সাথে হোক বা জীবনের অন্য কোনো অলিগলির সাথে। কিন্তু কদম, তুমি তো আস্ত একটা সিস্টেম। তুমি কেন পরকীয়া করতে যাবে? তুমি বরং এই গসিপটা উপভোগ করো, আর দেখবে তোমার অফিসের ভ্যাট ফাইলগুলোও আজ থেকে একটু অন্যরকম লাগবে।"
আমরা দুজন মিলে অফিসের জানালা দিয়ে বাইরের জ্যামে আটকে থাকা গাড়িগুলোর দিকে তাকালাম। কারো মুখে বিরক্তি, কারো মুখে চটুল হাসি। এই যে বিশাল শহর, এই যে হাজারো মানুষের লুকানো জীবন—সবই যেন এক বিশাল অডিট রিপোর্ট, যেখানে হাজারো গরমিল।
আমি হাসলাম। আজ আর কাজের চাপ অনুভব করছি না। কাল্পনিক এলিয়েনের সাথে এই মহাজাগতিক গসিপটা যেন আমার জীবনের নতুন এক 'রিয়েল কনসালটেশন'। আমি বুঝতে পারছি, জীবনকে এত সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই। মাঝে মাঝে একটু অগোছালো হতে হয়, একটু পরকীয়ার মতো জীবনের ছোটখাটো অনিয়মগুলোকে উপভোগ করতে হয়—নয়তো সিস্টেমটা ক্রাশ করবেই!
"এলিয়েন," আমি বললাম, "চলো, আজ আর অডিট নয়। আজ বরং পরকীয়ার মতো কোনো একটা অ্যাডভেঞ্চারে যাওয়া যাক। অন্তত একটা দিনের জন্য নীতি-দুর্নীতির এই ফাইলগুলো বন্ধ রাখি?"
এলিয়েন একটা দুষ্টু হাসি দিল। "চলো! আজ আমরা এই শহরের অডিটরদের চোখ ফাঁকি দিয়ে জীবনের সবচেয়ে বড় 'আন-অডিটেড' আনন্দটা খুঁজে আনি।"
(চলবে...)